হৃদরোগ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। হার্ট অ্যাটাক, হৃদযন্ত্রের ধমনিতে ব্লকেজ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন কিংবা হার্ট ফেলিওরের মতো সমস্যায় দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে হৃদরোগের চিকিৎসায় এসেছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অস্ত্রোপচার ছাড়াই বিশেষ মেডিক্যাল ডিভাইসের সাহায্যে হৃদযন্ত্রের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ বা চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে। করোনারি স্টেন্ট, পেসমেকার, ক্লোজার ডিভাইস, CRT এবং ICD—আধুনিক কার্ডিয়াক চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এই ডিভাইসগুলো কীভাবে কাজ করে, কোন সমস্যায় ব্যবহার করা হয় এবং হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে কী ধরনের জীবনযাপন প্রয়োজন—চলুন জেনে নেওয়া যাক।
করোনারি স্টেন্টিং কী এবং কেন করা হয়?
হৃদযন্ত্রের পেশিতে রক্ত পৌঁছে দেয় করোনারি ধমনি। এই ধমনিতে চর্বি ও অন্যান্য উপাদান জমে ধীরে ধীরে সংকোচন বা ব্লকেজ তৈরি হতে পারে। এর ফলে হৃদযন্ত্রে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হয় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই ধরনের ব্লকেজের চিকিৎসায় একটি বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো করোনারি স্টেন্টিং।
স্টেন্ট কীভাবে কাজ করে?
স্টেন্ট হলো ছোট একটি জালের মতো ধাতব কাঠামো। ক্যাথেটারের মাধ্যমে ব্লকেজযুক্ত ধমনিতে পৌঁছে প্রথমে বেলুনের সাহায্যে সংকুচিত অংশটি প্রসারিত করা হয়। এরপর সেখানে স্টেন্ট স্থাপন করা হয়। স্টেন্ট ধমনিকে খোলা রাখতে সাহায্য করে, ফলে রক্ত চলাচল সহজ হয়।
ড্রাগ-ইলিউটিং স্টেন্ট কী?
আধুনিক চিকিৎসায় ড্রাগ-ইলিউটিং স্টেন্ট (Drug-Eluting Stent বা DES) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এসব স্টেন্টে বিশেষ ওষুধের আবরণ থাকতে পারে, যা নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করে এবং স্টেন্ট বসানো জায়গায় পুনরায় সংকোচন বা ব্লকেজ হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
কিছু উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি বায়ো-অ্যাবজরবেবল বা শোষণযোগ্য স্টেন্ট নিয়েও কাজ হয়েছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে শরীরের টিস্যুর সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
হার্টের ফুটো বন্ধে ক্লোজার ডিভাইস
জন্মগত হৃদরোগের ক্ষেত্রে কিছু শিশুর হৃদযন্ত্রে জন্ম থেকেই অস্বাভাবিক ছিদ্র বা সংযোগ থাকতে পারে। এর মধ্যে ASD, VSD এবং PDA উল্লেখযোগ্য।
আগে এসব সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক সময় বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো। বর্তমানে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ক্যাথেটারের মাধ্যমে ক্লোজার ডিভাইস (Closure Device) ব্যবহার করে ছিদ্র বন্ধ করার চিকিৎসা করা যায়।
সাধারণত পায়ের রক্তনালীর পথ দিয়ে বিশেষ ক্যাথেটার হৃদযন্ত্রে পৌঁছানো হয় এবং উপযুক্ত অবস্থানে ডিভাইসটি স্থাপন করা হয়। সময়ের সঙ্গে শরীরের নিজস্ব কোষ ডিভাইসটির ওপর বৃদ্ধি পেয়ে সেটিকে হৃদযন্ত্রের দেওয়ালের অংশের মতো আবৃত করতে পারে।
তবে কোন রোগীর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি উপযুক্ত, তা নির্ভর করে হৃদযন্ত্রের গঠন, ছিদ্রের অবস্থান ও আকার এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর।
পেসমেকার কী? ধীরগতির হৃদস্পন্দনে এর ভূমিকা
আমাদের হৃদযন্ত্র একটি নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত স্পন্দিত হয়। এই বৈদ্যুতিক সংকেতের সমস্যা হলে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে ধীর হয়ে যেতে পারে।
হৃদস্পন্দন অত্যন্ত কমে গেলে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা ব্ল্যাকআউটের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পেসমেকার (Pacemaker) প্রয়োজন হতে পারে।
পেসমেকার কীভাবে কাজ করে?
পেসমেকার হৃদযন্ত্রের স্পন্দন পর্যবেক্ষণ করে। হৃদস্পন্দন প্রয়োজনের তুলনায় কমে গেলে এটি বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠিয়ে হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিক ছন্দে স্পন্দিত হতে সাহায্য করে।
আধুনিক প্রযুক্তিতে এমন পেসমেকারও রয়েছে যেগুলো নির্দিষ্ট MRI পরীক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি এসেছে লিডলেস পেসমেকার (Leadless Pacemaker), যেখানে প্রচলিত পেসমেকারের মতো দীর্ঘ তার বা শরীরের বাইরে আলাদা পকেট তৈরির প্রয়োজন হয় না।
CRT: হার্ট ফেলিওরের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি
CRT বা Cardiac Resynchronization Therapy হলো এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যা নির্দিষ্ট ধরনের হার্ট ফেলিওরের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।
হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন অংশের সংকোচনের মধ্যে সমন্বয় নষ্ট হতে পারে। নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে CRT হৃদযন্ত্রের পাম্পিংয়ের সমন্বয় উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষ করে কম Ejection Fraction-এর সঙ্গে নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক ও হৃদযন্ত্রের কার্যগত সমস্যার উপস্থিতিতে চিকিৎসক CRT বিবেচনা করতে পারেন।
ICD কী এবং কেন ব্যবহার করা হয়?
ICD বা Implantable Cardioverter Defibrillator হলো এমন একটি বিশেষ ডিভাইস, যা নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন শনাক্ত করে চিকিৎসা দিতে পারে।
হৃদযন্ত্রের ছন্দ অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গেলে ICD সেই অস্বাভাবিক ছন্দ শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী বৈদ্যুতিক চিকিৎসা দিতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো মারাত্মক অ্যারিথমিয়ার কারণে আকস্মিক হৃদ্মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো।
তবে ICD সবার জন্য প্রয়োজন হয় না। রোগীর হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা, পূর্ববর্তী অ্যারিথমিয়ার ইতিহাস এবং অন্যান্য ক্লিনিক্যাল বিষয় বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
আধুনিক হার্টের চিকিৎসা কি সবসময় অস্ত্রোপচারনির্ভর?
আধুনিক কার্ডিয়াক চিকিৎসার অন্যতম বড় অগ্রগতি হলো—অনেক সমস্যার ক্ষেত্রে ক্যাথেটারভিত্তিক বা ডিভাইস-ভিত্তিক চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্টেন্টিংয়ের মাধ্যমে করোনারি ধমনির নির্দিষ্ট ব্লকেজের চিকিৎসা, ক্লোজার ডিভাইসের মাধ্যমে কিছু জন্মগত হৃদযন্ত্রের ছিদ্র বন্ধ করা এবং পেসমেকার, CRT বা ICD-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক ও পাম্পিং সমস্যার চিকিৎসা—সবই আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে প্রতিটি ডিভাইসের ব্যবহার রোগীর জন্য আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হয়। একই ধরনের উপসর্গ থাকলেও সবার চিকিৎসা এক নয়।
হার্ট ভালো রাখতে দৈনন্দিন জীবনে কী করবেন?
আধুনিক চিকিৎসা হৃদরোগের জটিল পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রতিরোধমূলক জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে—
- পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং শরীরকে পর্যাপ্ত আর্দ্র রাখুন।
- অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
- ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করুন।
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হালকা হাঁটা বা উপযুক্ত কায়িক পরিশ্রমের অভ্যাস করুন।
- শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা হৃদরোগের উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করবেন না।
বুকে ব্যথা হলে কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?
বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিকভাবে হাঁফ ধরা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি হৃদযন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে নতুন বা তীব্র উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হার্ট অ্যাটাকের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উপসর্গ গুরুতর হলে অপেক্ষা না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
শেষ কথা
স্টেন্ট, পেসমেকার, ক্লোজার ডিভাইস, CRT এবং ICD—হৃদরোগের বিভিন্ন জটিল সমস্যার চিকিৎসায় আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা আরও নির্দিষ্ট, কার্যকর ও কম আক্রমণাত্মক পদ্ধতিতে করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে কোনো ডিভাইসই নিজে থেকে সবার জন্য উপযুক্ত নয়। রোগীর সমস্যা, বয়স, হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা, অন্যান্য শারীরিক অবস্থা এবং পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে কার্ডিওলজিস্ট চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন।
তাই হার্টের সমস্যা বা হৃদরোগের উপসর্গ থাকলে নিজে থেকে চিকিৎসা না করে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
ডিসক্লেমার: এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শের বিকল্প নয়। হৃদরোগের উপসর্গ বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নিন।


