হৃদযন্ত্র বা হার্ট মানবদেহের একটি শক্তিশালী পেশি, যা অবিরাম পাম্প করে সারা শরীরে রক্ত ও অক্সিজেন সঞ্চালন বজায় রাখে। এই পেশিকে সচল ও কার্যক্ষম রাখতে হার্টের নিজস্ব ধমনিগুলোর (করোনারি আর্টারি) মাধ্যমে রক্ত চলাচল করা আবশ্যক। কিন্তু কোনো কারণে এই ধমনিতে হঠাৎ রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে হার্টের পেশিতে অক্সিজেনের চরম ঘাটতি দেখা দেয় এবং পেশিকোষ নষ্ট হতে থাকে। চিকিৎসার পরিভাষায় এই বিপজ্জনক জরুরি অবস্থাকেই বলা হয় হার্ট অ্যাটাক।
দেরি না করে সঠিক সময়ে লক্ষণ চিনে ব্যবস্থা নিলে অমূল্য প্রাণ রক্ষা করা এবং হার্টের মারাত্মক ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে কি না কীভাবে বুঝবেন?
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সবসময় খুব চেনা নাও হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কিছু উপসর্গ দেখা দিলে একটুও দেরি করা উচিত নয়:
- বুকে প্রচণ্ড চাপ ও ব্যথা: বুকের ঠিক মাঝখানে পাথর বা ভারী কিছু চেপে বসার মতো তীব্র অনুভূতি হওয়া। মনে হতে পারে বুক কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছে।
- ব্যথা ছড়িয়ে পড়া: বুকের এই তীব্র ব্যথা চোয়াল, কাঁধ কিংবা বাঁ হাতের ভেতরের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে।
- অতিরিক্ত ঘাম ও মৃত্যুভয়: কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড ঘাম হওয়া এবং তীব্র আতঙ্ক বা মৃত্যুভয় (ইম্পেন্ডিং ডুম) অনুভব হওয়া।
- ওষুধে ব্যথা না কমা: যাঁদের আগে থেকেই হার্টের সমস্যা রয়েছে, তাঁরা বুকে ব্যথা হলে সাধারণত জিভের নিচে সরবিট্রেট ট্যাবলেট ব্যবহার করে আরাম পান। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে এই ট্যাবলেট নেওয়ার পরও ২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে ব্যথা বজায় থাকে বা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
- হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট: বুকে ব্যথার পাশাপাশি হঠাৎ দম বন্ধ হয়ে আসা বা শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া।
সময় বাঁচানোই হার্ট বাঁচানোর মূল চাবিকাঠি
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বহুল প্রচলিত কথা রয়েছে—“Time is Muscle”। অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক শুরু হওয়ার পর যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, হার্টের পেশির ক্ষতি তত কম হয় এবং রোগীর জীবন বাঁচানো সহজ হয়।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত করতে জটিল কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না; কেবল একটি দ্রুত ইসিজি (ECG) পরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায় হার্ট অ্যাটাক হয়েছে কি না।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি
১. প্রাইমারি অ্যানজিওপ্লাস্টি (Primary Angioplasty)
বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে তীব্র হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে কার্যকর ও যুগান্তকারী চিকিৎসা হলো প্রাইমারি অ্যানজিওপ্লাস্টি।
- পদ্ধতি: ক্যাথেটার ল্যাব (Cath Lab) সুবিধাযুক্ত হাসপাতালে রোগীর হাতের কবজির কাছে লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে অবশ করা হয়। এরপর একটি সরু পাইপ বা তারের সাহায্যে ধমনির ভেতরে যেখানে রক্ত জমাট বেঁধেছে, সেখানে পৌঁছানো হয়। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে রক্তের দলা (ক্লট) বের করে আনা হয় এবং একটি বেলুন ফুলিয়ে ধমনি প্রসারিত করা হয়। পুনরায় যাতে রক্তনালি বন্ধ না হয়ে যায়, সেজন্য সেখানে একটি ধাতব জাল বা ‘স্টেন্ট’ (Stent) বসিয়ে দেওয়া হয়।
- সুবিধা: অত্যন্ত কম সময়ে (প্রায় ১ ঘণ্টার মধ্যে) রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করা যায়। রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন।
২. থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি বা ক্লট-বাস্টিং ইনজেকশন
সব জায়গায় বা প্রত্যন্ত জেলাস্তরের সব হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ক্যাথ ল্যাব বা অ্যানজিওপ্লাস্টির সুবিধা থাকে না। সেক্ষেত্রে বড় হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলে প্রথম তিন ঘণ্টার মধ্যে শিরায় একটি বিশেষ ক্লট-বাস্টিং ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয় (থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি)। এই ইনজেকশন রক্তনালির জমাট রক্ত গলিয়ে তাৎক্ষণিক রক্তপ্রবাহ সচল করে। এর ফলে রোগী মূল্যবান কিছু সময় পান এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বড় কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনমাফিক পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নিতে পারেন।
হার্ট অ্যাটাকের পর দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিয়ম
অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে, হার্ট অ্যাটাকের পর রোগীকে সারাক্ষণ বিছানায় শুইয়ে বা বসিয়ে পূর্ণ বিশ্রামে রাখা উচিত। এটি সম্পূর্ণ ভুল। হার্টকে সুস্থ রাখতে রোগীকে সঠিক নিয়মে সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
১. কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম (Cardiac Rehabilitation):
ধাপে ধাপে শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোই এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য। প্রথম কয়েক সপ্তাহ ঘরের মধ্যে স্বাভাবিক হাঁটাচলা এবং পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে ধীরে ধীরে বাইরের রাস্তায় হাঁটার মাধ্যমে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে রোগী সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরতে পারেন।
২. নিয়মিত ওষুধ সেবন:
রক্ত পাতলা রাখার ওষুধ (যেমন অ্যাসপিরিন, ক্লোপিডোগ্রেল) এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের স্ট্যাটিনজাতীয় ওষুধ প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নিয়মিত ও নিয়ম মেনে চালিয়ে যেতে হবে।
৩. স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাস:
- অতিরিক্ত তেল, চর্বিযুক্ত খাবার ও ফাস্ট ফুড পুরোপুরি বর্জন করুন।
- খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল রাখুন এবং সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিচ্ছন্ন জল পান করুন।
- সকালের পুষ্টিকর প্রাতঃরাশ কখনোই বাদ দেবেন না; স্বাস্থ্যকর প্রাতঃরাশ শরীরে সঠিক শক্তির জোগান দেয়।
- ধূমপান ও যে কোনো ধরনের তামাকজাত পণ্য সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন।


