নাক ও সাইনাসের সমস্যা: কারণ, লক্ষণ এবং আধুনিক চিকিৎসা

ডাঃ চিরঞ্জিত দত্ত (ইএনটি স্পেশালিস্ট)

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নাক বন্ধ থাকা, নাক চুলকানো, অনবরত হাঁচি বা মাথা ভারী হয়ে থাকার মতো সমস্যাগুলো অত্যন্ত সাধারণ। অনেকেই একে সাধারণ সর্দি-কাশি মনে করে অবহেলা করেন, কিন্তু এগুলো হতে পারে সাইনুসাইটিস (Sinusitis) বা নাকের অন্য কোনো জটিলতার লক্ষণ। বিখ্যাত ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডাঃ চিরঞ্জিত দত্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে উঠে এলো নাক ও সাইনাসের বিভিন্ন সমস্যা এবং তার প্রতিকার।

সাইনাস বনাম সাইনুসাইটিস: ভুল ধারণা ও আসল তথ্য

সাধারণ মানুষ প্রায়ই বলেন, “আমার সাইনাস আছে”। চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণাটি ভুল। অ্যাপেন্ডিক্স যেমন সবার শরীরে থাকে, সাইনাসও তেমনি সবারই আছে। সমস্যাটি তখন হয় যখন সাইনাসে ইনফেকশন বা ইনফ্লামেশন (প্রদাহ) হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সাইনুসাইটিস বলা হয়।

  • প্রধান লক্ষণ: মাথা ধরা, মুখ বা কপাল সারাক্ষণ ভারী হয়ে থাকা, নাকের ভেতরে অস্বস্তি এবং সর্দি বা জ্বর জ্বর ভাব।

রোগ নির্ণয় ও আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা

লক্ষণ দেখে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও সঠিক চিকিৎসার জন্য সঠিক রোগ নির্ণয় জরুরি।

  • ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন: প্রথমে রোগীর ইতিহাস (History) জানা এবং নাকের ভেতরটা ভালো করে পরীক্ষা করা হয়।
  • এন্ডোস্কোপি (Endoscopy): আজকাল নাকের ভেতর এন্ডোস্কোপি করে সাইনাসের ওপেনিং বা ভেতরের অবস্থা, যেমন কোনো পলিপ (Polyp) বা নাকের হাড় বাঁকা আছে কিনা তা সরাসরি দেখে নেওয়া হয়।
  • সিটি স্ক্যান (CT Scan): আগে এক্স-রে করার চল থাকলেও, আধুনিক চিকিৎসায় এক্স-রে অনেকটাই ‘আউট অফ ফ্যাশন’। কারণ এক্স-রে অনেক সময় ভুল রেজাল্ট দিতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যায় সিটি স্ক্যান সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।

নাকের হাড় বাঁকা ও পলিপের চিকিৎসা

অনেকেরই ধারণা নাকের হাড় সামান্য বাঁকা হলেই অপারেশনের প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, প্রায় সবারই নাকের হাড় কম-বেশি বাঁকা থাকে। যতক্ষণ না এটি তীব্র নাক বন্ধ বা শ্বাসকষ্টের কারণ হচ্ছে, ততক্ষণ অপারেশনের প্রয়োজন নেই। তবে পলিপের ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

বড়দের বনাম বাচ্চাদের সমস্যা: অ্যাডিনয়েড (Adenoid)

বড়দের মতো বাচ্চাদেরও নাকের সমস্যা হতে পারে, যার অন্যতম কারণ অ্যাডিনয়েড। এটি আসলে গলার টনসিলের মতোই এক ধরণের স্ট্রাকচার, যা নাক ও গলার সংযোগস্থলে থাকে।

  • বাচ্চাদের লক্ষণ: বাচ্চা হা করে ঘুমায়, মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়, রাতে নাক ডাকে এবং কানে কম শোনার কারণে স্কুলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়।
  • প্রতিকার: গরমের দেশে এই সমস্যা কম হলেও, লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ বাচ্চার ভবিষ্যৎ এর ওপর নির্ভর করতে পারে।

নাক ডাকার সমস্যা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea)

নাক ডাকা কেবল একটি সামাজিক অস্বস্তি নয়, এটি একটি মারাত্মক শারীরিক সমস্যাও হতে পারে, যাকে স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা হয়। ঘুমের মধ্যে সাময়িকভাবে (১০ সেকেন্ড বা তার বেশি) শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়াকে স্লিপ অ্যাপনিয়া বলে। এর ফলে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, যা ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস এবং হাইপারটেনশনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিকার ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন: নাক ডাকা কমানোর প্রথম পদক্ষেপ হলো ওজন কমানো, শোয়ার আগে মদ্যপান বা ঘুমের ওষুধ না খাওয়া, এবং রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার (ডিনার) না খাওয়া। জলনেতির মতো যোগব্যায়ামও এক্ষেত্রে দারুণ উপকারী। ওষুধ বা ক্লিপের চেয়ে লাইফস্টাইল পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে আধুনিক সার্জারি বা বিশেষ অ্যাপ্লায়েন্স (যেমন CPAP মেশিন) এর মাধ্যমে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব।