জরায়ুতে ফাইব্রয়েড (Fibroid) বা মায়োমা কী? কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও সন্তান ধারণে এর প্রভাব

জরায়ুতে ফাইব্রয়েড কী?

জরায়ুর (Uterus) পেশির স্তর থেকে যে অ-ক্যান্সারজাত (Benign) টিউমার তৈরি হয় তাকে ফাইব্রয়েড বা মায়োমা বলা হয়। এটি নারীদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা। বিশেষ করে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ বছর বয়সী প্রতি ১০০ জন নারীর মধ্যে প্রায় ২০ জনের শরীরে কোনো না কোনো ধরনের ফাইব্রয়েড থাকতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা যায় না এবং সব ফাইব্রয়েডের চিকিৎসাও প্রয়োজন হয় না।


জরায়ুতে ফাইব্রয়েড কেন হয়?

বর্তমানে ফাইব্রয়েড হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে কয়েকটি বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে—

  • শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেশি থাকা
  • পারিবারিক বা জেনেটিক প্রবণতা
  • সন্তান ধারণের বয়সে থাকা
  • কিছু হরমোনজনিত পরিবর্তন

জরায়ুতে ফাইব্রয়েডের লক্ষণ

সব রোগীর একই ধরনের উপসর্গ থাকে না। তবে সাধারণত দেখা যায়—

  • অতিরিক্ত মাসিক রক্তপাত
  • দীর্ঘদিন ধরে মাসিক হওয়া
  • অনিয়মিত মাসিক
  • মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা
  • তলপেটে ভারীভাব বা চাপ অনুভব
  • পেটে গিঁটের মতো অনুভূতি
  • রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)
  • সন্তান ধারণে সমস্যা

অনেকের আবার কোনো উপসর্গই থাকে না এবং আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করার সময় ঘটনাক্রমে ধরা পড়ে।


ফাইব্রয়েড কি সন্তান ধারণে বাধা দেয়?

সব ক্ষেত্রে নয়।

ফাইব্রয়েড কোথায় রয়েছে এবং কত বড়—তার ওপর নির্ভর করে গর্ভধারণে প্রভাব পড়ে।

যদি ফাইব্রয়েড জরায়ুর ভেতরের অংশে (Cavity) থাকে, তাহলে ভ্রূণ স্থাপনে (Implantation) সমস্যা হতে পারে। আবার বড় আকারের ফাইব্রয়েড থাকলে—

  • গর্ভপাতের ঝুঁকি
  • প্রিটার্ম লেবার
  • গর্ভাবস্থার জটিলতা

বাড়তে পারে।

তবে অনেক মহিলাই ফাইব্রয়েড থাকা সত্ত্বেও স্বাভাবিকভাবে মা হতে পারেন।


কীভাবে ফাইব্রয়েড নির্ণয় করা হয়?

সাধারণত চিকিৎসক প্রথমে রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা করেন।

এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো—

  • Transvaginal Ultrasonography (TVS)

প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষেত্রে MRI বা CT Scan করা হতে পারে।


সব ফাইব্রয়েডের চিকিৎসা কি দরকার?

না।

যদি—

  • কোনো উপসর্গ না থাকে
  • ছোট আকারের হয়
  • দ্রুত বড় না হয়

তাহলে নিয়মিত ফলো-আপই যথেষ্ট।

কিন্তু যদি—

  • অতিরিক্ত রক্তপাত হয়
  • ব্যথা থাকে
  • সন্তান ধারণে সমস্যা হয়
  • ফাইব্রয়েড দ্রুত বড় হয়

তাহলে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।


ফাইব্রয়েডের চিকিৎসা কী?

১. ওষুধ

কিছু হরমোনজাতীয় ওষুধ সাময়িকভাবে ফাইব্রয়েড ছোট করতে পারে।

তবে—

  • এটি স্থায়ী সমাধান নয়।
  • ওষুধ বন্ধ করলে আবার আগের আকারে ফিরে আসতে পারে।

অতিরিক্ত রক্তপাত কমানোর জন্যও কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়।


২. অস্ত্রোপচার

Myomectomy

যারা ভবিষ্যতে সন্তান নিতে চান, তাদের ক্ষেত্রে সাধারণত শুধু টিউমারটি অপসারণ করা হয় এবং জরায়ু রেখে দেওয়া হয়।

Hysterectomy

যাদের সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা নেই এবং গুরুতর উপসর্গ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে জরায়ুসহ ফাইব্রয়েড অপসারণ করা হতে পারে।


ল্যাপারোস্কোপিক নাকি ওপেন সার্জারি—কোনটি ভালো?

বর্তমানে দুই ধরনের অস্ত্রোপচারই প্রচলিত।

ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সুবিধা

  • ছোট ছিদ্র দিয়ে অপারেশন
  • কম ব্যথা
  • দ্রুত সুস্থ হওয়া
  • হাসপাতালে কমদিন থাকতে হয়
  • দ্রুত কাজে ফেরা যায়

ওপেন সার্জারির সুবিধা

  • বড় ফাইব্রয়েডে কার্যকর
  • ক্ষত ভালোভাবে মেরামত করা যায়
  • জটিল ক্ষেত্রে সুবিধাজনক

রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক উপযুক্ত পদ্ধতি নির্বাচন করেন।


অপারেশনের পর কবে সন্তান নেওয়া উচিত?

মায়োমেকটমির পরে জরায়ুর ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে উঠতে সময় লাগে।

সাধারণত—

  • অন্তত ৩ মাস অপেক্ষা করা উচিত।
  • ৬ মাস অপেক্ষা করলে আরও ভালো।

এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভধারণের চেষ্টা করা উচিত।


ফাইব্রয়েড কি ক্যান্সারে পরিণত হয়?

সাধারণভাবে না।

ফাইব্রয়েড থেকে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বিরল।

তবে যদি—

  • মেনোপজের পরে হঠাৎ ফাইব্রয়েড বড় হতে শুরু করে
  • নতুন করে রক্তপাত হয়
  • তীব্র ব্যথা শুরু হয়

তাহলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।


ফাইব্রয়েড কি আবার ফিরে আসতে পারে?

হ্যাঁ।

যদি জরায়ু রেখে শুধুমাত্র ফাইব্রয়েড অপসারণ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন ফাইব্রয়েড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাই নিয়মিত ফলো-আপ এবং আল্ট্রাসোনোগ্রাফি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?

ফাইব্রয়েড প্রতিরোধ করার নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই।

তবে—

  • নিয়মিত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
  • অতিরিক্ত মাসিক রক্তপাতকে অবহেলা করবেন না।
  • প্রয়োজনে দ্রুত আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করুন।
  • রক্তস্বল্পতা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
  • বছরে অন্তত একবার গাইনোকোলজিক্যাল চেকআপ করুন।

উপসংহার

জরায়ুর ফাইব্রয়েড অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা। সব ফাইব্রয়েড বিপজ্জনক নয় এবং সব ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। তবে অতিরিক্ত রক্তপাত, তীব্র ব্যথা বা সন্তান ধারণে সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।