এককথায় পেটে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফ্যাট জমে পেট মোটা হলে তাকে ভুঁড়ি বলে। পেটে চর্বি জমে দু’ভাবে। ওপরে এবং ভিতরে।
পেট হল অনেকটা বাজারের থলির মতো। এই থলির মধ্যে সবজির বদলে থাকে স্টমাক, লার্জ ইন্টেস্টাইন, লিভার, স্পিন, প্যাংক্রিয়াস। এখন এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করার দরকার পড়ে। না হলে এক ঘুষিতেই পেটের ভিতরের অঙ্গগুলি ফেটে যেত। অন্দরের অঙ্গগুলিকে রক্ষা করার ভার নেয় আমাদের ত্বকের সাবকিউটেনিয়াস স্তরে থাক চর্বির আস্তরণ এবং এই স্তরের নিচে থাকে মাংসপেশির স্তর।
অতএব বোঝাই যাচ্ছে চর্বির পরত না থাকলে পেটের অন্দরের অঙ্গগুলি রক্ষা পেত না। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, আমাদের সারা শরীরেই এভাবেই ত্বকের নিচে চর্বির পরত রয়েছে। এই চর্বির অংশ একাধারে যেমন শরীরের অন্দরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্ষা করে তেমনই, শরীরের এনার্জির দরকার পড়লে এরা তার জোগান দেয়। আফশোসের বিষয়, পেটের ত্বকে থাকা চর্বি অতিরিক্ত পরিমাণে জমলে তা ভুঁড়ির আকার নিতে পারে।
পেটের অন্দরের চর্বি-
শুধু ত্বকের নিচেই নয়, চর্বি জমে পেটের ভিতরেও। আগেই বলেছি পেট হল ফাঁকা থলির মতো। আর পেটের এই ফাঁকা অংশে যখন ফ্যাট বা চর্বি জমার আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলে ভিসেরাল ফ্যাট। এই ফ্যাট মারাত্মক ক্ষতিকর। এগুলি পেটের ফাঁকা অংশে, আভ্যন্তরীণ অঙ্গের চারিদিকে জমতে থাকে। ঘিরতে থাকে লিভার, প্যাংক্রিয়াস, স্টমাকের মতো অঙ্গগুলিকে।
ভুঁড়ির বিষ-
ভিসেরাল ফ্যাট থেকে ক্ষরিত হয় বিশেষ ধরনের টক্সিন বা বিষের মতোই ক্ষতিকর পদার্থ। এই বিষবৎ রাসায়নিক পরোক্ষ ভাবে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে টাইপ টু ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ, ব্রেস্ট ক্যানসার, কোলোরেক্টাল ক্যানসার, অ্যালঝাইমারস ডিজিজ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হাই কোলেস্টেরল, ডিমেনশিয়া, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, গলব্লাডার স্টোন, ফ্যাটি লিভার, পলি সিস্টিক ওভারি এমনকী ক্যানসারের আশঙ্কা।
কেন জমে চর্বি-
চর্বি একদিনে জমে না। বহুদিনের অসংযমী জীবনযাপনের ফলাফলই হল চর্বি। অলসভাবে দিনাতিপাত, প্রচুর পরিমাণে ফাস্টফুড, কোল্ডড্রিংকস, তেলেভাজা, ফাস্টফুড, প্রসেসড ফুড, প্যাকেটজাত খাবার, চিপস, অ্যালকোহল খাওয়া এবং পরিশ্রম থেকে বিরত থাকাই ভুঁড়ি হওয়ার অন্যতম বড় কারণ।
কাজ না করলেই হবে ভুঁড়ি-
আসলে আমরা যখনই কোনও খাবার খাই, তখনই তা থেকে কিছু পরিমাণ এনাজি বা শক্তি সঞ্চিত হয় আমাদের শরীরে। এই শক্তি আমরা বিভিন্ন কাজে খরচ করি। কাজ অর্থাৎ শারীরিক পরিশ্রমকে বোঝানো হচ্ছে। যে যত বেশি পরিশ্রম করবে তার শরীর থেকে তত বেশি এনার্জি খরচ হবে। এখন, কেউ বেশি পরিমাণ খাদ্য খেয়ে অতি স্বল্প পরিমাণ পরিশ্রম করে, সেক্ষেত্রে এনার্জি খরচ হবে না। এই উদ্বৃত্ত এনার্জি জমা হবে ফ্যাট রূপে। বাড়বে ওজন। অর্থাৎ ওজন তখনই বাড়ছে, যখন শরীরে ক্রমান্বয়ে শক্তি পাঠানো হলেও, শরীর তা খরচ করছে না। খেয়া করলে দেখা যাবে, প্রচুর খাবার খেলেও বাচ্চাদের ভুঁড়ি হয় না। তার কারণ তারা সর্বক্ষণ ছুটে বেড়ায়, খেলা করে। শরীরটা কাজ করে যায়, ফ্যাট জমতে সাহস পায় না দেহে। অথচ বড় হওয়ার পর সারাদিন ডেস্কের পিছনে বসে কাজ করতে করতে কোনও এনার্জিজইি খরচ হয় না। ফলে সহজেই ভুঁড়ি হয়ে যায় মানুষের।
এটা একটা কারণ। আরও একটা বড় কারণ হল, বেশ কিছু খাদ্য আছে যেগুলিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি (খাদ্যের সঙ্গে যে পরিমাণ এনার্জি ঢোকে তার একক) থাকে। এই খাদ্য অল্পপরিমাণে খেলেও প্রচুর এনার্জি প্রবেশ করে শরীরে। প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রম না করলে এই বিশাল পরিমাণ এনার্জি খরচ হয় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, এক বোতল বিয়ার খেতে সময় লাগে ২০ মিনিট। আর বিয়ারের সঙ্গে যে পরিমাণ এনার্জি ঢোকে শরীরে, তা খরচ করতে কম করে ১ ঘন্টা ঘাম ঝরিয়ে পরিশ্রম করতে হবে। অধিকাংশ মানুষই তা করেন না। বিয়ারের মতোই আরও কতকগুলি খাদ্য হল, আইসক্রিম, তেলেভাজা, মিষ্টি, পট্যাটো চিপস এইসব।
ছেলেবেলার অপুষ্টি আর ভুঁড়ি-
ভুঁড়ি হওয়ার পিছনে অলসতা যেমন দায়ী তেমনই আরও একটা বড় কারণ হল জিন এবং অপুষ্টি।জিনগত কারণে ভারতীয়দের শরীরে মাংসপেশির পরিমাণ কম থাকে। ফলে শরীরে ফ্যাট জমার সুযোগ বেশি থাকে। অন্যদিকে ছেলেবেলার অপুষ্টিও ফ্যাট জমার অন্য একটি বড় কারণ। ভারত হল উন্নয়নশীল দেশ। এদেশে আজও দারিদ্র রয়ে গিয়েছে। দারিদ্র আর অপুষ্টির অবস্থান পাশাপাশি। শৈশবে সঠিক পরিমাণে প্রোটিন জাতীয় খাদ্যে গ্রহণে না খাওয়ার ফলে মাংসপেশি সঠিকভাবে গঠিত হয় না এদেশের মানুষের। এরপর যুবক বয়সে কর্মজগতে প্রবেশ করার পর বেশিরভাগ মানুষই উপার্জনক্ষম হয়। উপার্জন করতে শেখার পর তাদের আর খাদ্যের সমস্যা থাকে না। মুশকিল হল, খাদ্যের সমস্যা না থাকলেও ততদিনে তারা বিশ্বায়নের কবলে পড়ে গিয়েছে। ফলে পশ্চিমী দেশের অনুকরণে দেশীয় খাদ্য বর্জন করে তারা ঝুঁকছে প্যাকেটজাত খাদ্যের দিকে। ভাত, রুটি সবজি ছেড়ে তারা মুখে তুলে নিচ্ছে বার্গার, পিৎজা। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের অভাবে তাদের দেহে ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। দেখা গিয়েছে, ছোটবেলায় যাদের হাড় জিরজিরে চেহারা ছিল তাদেরই বড় হওয়ার পর যথেষ্ট বড় ভুঁড়ি হয়।


