পোস্ট-ম্যারিটাল কাউন্সেলিং: সুখী দাম্পত্যের পথে কতটা জরুরি?

সাক্ষাৎকারে: ডা. অর্ণব দত্ত, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
সাক্ষাৎকার গ্রহণে: পৌলমী


ভূমিকা

বিয়ে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে বিয়ের পর নতুন সম্পর্ক, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে অনেক দম্পতিই নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে পোস্ট-ম্যারিটাল কাউন্সেলিং। এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অর্ণব দত্ত


পোস্ট-ম্যারিটাল কাউন্সেলিং কী?

ডা. দত্তের মতে, পোস্ট-ম্যারিটাল কাউন্সেলিং হলো বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে সুস্থ ও স্থিতিশীল রাখতে পরিচালিত কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া। একে অনেক ক্ষেত্রে রিলেশনশিপ কাউন্সেলিং বলেও অভিহিত করা হয়।


বিয়ের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা কী?

ডা. দত্ত জানান, বিয়ের প্রথম কয়েক মাসে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাগুলি দেখা যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা বা যৌনজীবন সংক্রান্ত সমস্যা। অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রীর প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক তৈরি হয়, যা সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলে।


বিয়ের পর কি সত্যিই মানুষ বদলে যায়?

এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. দত্ত বলেন, এটি কোনো মিথ নয়। বিয়ের আগে এবং পরে একজন মানুষের ভূমিকা ও দায়িত্বের পরিবর্তন ঘটে।

বিয়ের আগে যে মানুষটি দিনের মধ্যে বারবার ফোন করতেন, বিয়ের পরে সংসার, অর্থনৈতিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চাপে সেই সময় দেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। ফলে অনেক সময় একজন সঙ্গী অন্যজনকে ভুল বোঝেন এবং মনে করেন তিনি আর আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছেন না।

তাঁর মতে, এই ধরনের বাস্তব পরিবর্তন সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন করার জন্য প্রি-ম্যারিটাল কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


ছোট ছোট বিষয় কি বড় সমস্যার কারণ হতে পারে?

ডা. দত্তের স্পষ্ট বক্তব্য, “বিন্দু বিন্দু জলেই সিন্ধু তৈরি হয়।”

কাজের ভাগাভাগি, সময় না দেওয়া, যোগাযোগের অভাব—এসব ছোট সমস্যা যদি প্রথমেই চিহ্নিত করা যায়, তাহলে বড় সংঘাত এড়ানো সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রেই অল্প কয়েকটি কাউন্সেলিং সেশনেই সমাধান হয়ে যায়।


‘সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট’ কতটা ক্ষতিকর?

ঝগড়ার পর কথা বন্ধ করে দেওয়াকে অনেকেই সমাধান বলে মনে করেন। কিন্তু ডা. দত্তের মতে, এটি কোনো সমাধান নয়।

তিনি বলেন, কথা না বললে সমস্যা জমতে থাকে, কিন্তু সমাধান হয় না। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে হবে এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলর, সাইকোথেরাপিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে।


সোশ্যাল মিডিয়া ও পার্টনারের ফোন চেক করা কি সম্পর্কের জন্য ভালো?

ডা. দত্ত মনে করেন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, পার্টনারের ফোন অনুমতি ছাড়া চেক করা উচিত নয়। কারণ এটি সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ প্রবণতা বাড়ায়। আর সন্দেহ এমন একটি বিষয় যা দ্রুত একটি সম্পর্ককে ভেঙে দিতে পারে।

তবে পারস্পরিক সম্মতি ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে আলোচনা করা যেতে পারে।


শ্বশুরবাড়ির হস্তক্ষেপ কতটা প্রভাব ফেলে?

ভারতীয় পরিবারে এই সমস্যা বহুল পরিচিত হলেও ডা. দত্তের মতে, এটি বিশ্বজুড়েই দেখা যায়।

তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করলে সম্পর্কের মধ্যে অশান্তি তৈরি হয়। তাই পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রেখেও দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর সীমারেখা (Boundary) তৈরি করা জরুরি।


সম্পর্কে একজন বেশি মানিয়ে নিলে কি সম্পর্ক টিকে থাকে?

ডা. দত্তের মতে, একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সমঝোতা ও সমান অংশগ্রহণ

যদি একজন সবসময় মানিয়ে নেন আর অন্যজন কোনো চেষ্টা না করেন, তাহলে সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকে না। তাঁর মতে, আদর্শ পরিস্থিতি হলো উভয় পক্ষের সমান দায়িত্ব ও সমঝোতা।


‘আমি আগে সরি বলব না’—এই মানসিকতা কতটা ক্ষতিকর?

ডা. দত্ত বলেন, “সরি বলা মানে হেরে যাওয়া নয়।”

ভুল স্বীকার করার মধ্যে দুর্বলতা নয়, বরং পরিপক্বতা রয়েছে। তবে একই ভুল বারবার করে শুধুমাত্র ‘সরি’ বললে তা সম্পর্ককে সুস্থ রাখে না। ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি আচরণগত পরিবর্তনও জরুরি।


লাভ ম্যারেজে কি বিচ্ছেদের হার বেশি?

ডা. দত্তের মতে, বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে লাভ ম্যারেজে বিচ্ছেদের হার তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত প্রত্যাশা, তুলনা এবং ইগো-সংক্রান্ত সমস্যা।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এর অর্থ এই নয় যে লাভ ম্যারেজ করা উচিত নয়। বরং সম্পর্কের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।


কখন বুঝবেন পেশাদার সাহায্য নেওয়ার সময় এসেছে?

নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা দিলে পেশাদার সাহায্য নেওয়া উচিত—

  • নিয়মিত ঝগড়া ও মতবিরোধ
  • যৌনজীবনে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা
  • পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব
  • বিশ্বাস ও আস্থার সংকট
  • একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি
  • সম্পর্কে দূরত্ব বেড়ে যাওয়া

ডা. দত্তের মতে, কাউন্সেলিং তখনই কার্যকর হয় যখন দুজনেই সম্পর্ক বাঁচাতে আগ্রহী হন। একতরফা ইচ্ছা থাকলে সফলতার সম্ভাবনা কমে যায়।


উপসংহার

বিয়ে শুধু দুজন মানুষের নয়, দুটি জীবনের মিলন। সেখানে মতের অমিল, ভুল বোঝাবুঝি বা মানসিক চাপ আসতেই পারে। কিন্তু সময়মতো আলোচনা, পারস্পরিক সম্মান এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অধিকাংশ সমস্যারই সমাধান সম্ভব।

ডা. অর্ণব দত্তের কথায়, “সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আগেই সাহায্য নিন। কারণ অনেক সময় সামান্য সচেতনতাই একটি সুন্দর সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।”