বর্তমান সময়ে হৃদ্রোগ শুধু বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে কম বয়সীদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মধ্যে জিনগত কারণেও এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
হার্ট অ্যাটাকের প্রধান রিস্ক ফ্যাক্টর
নিচের বিষয়গুলো হৃদ্রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়—
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার
- ডায়াবেটিস
- উচ্চ রক্তচাপ
- রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকা
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- নিয়মিত ব্যায়াম না করা
- অতিরিক্ত তেল, চর্বি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া
- দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ
- পরিবারে অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস
বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে আগে থেকেই হৃদ্রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে কী করবেন?
যদি বুকে চাপধরা ব্যথা ১০–১৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়, শ্বাসকষ্ট হয়, ব্যথা বাঁ হাত, কাঁধ, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সময় নষ্ট না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে হবে।
জরুরি অবস্থায় যা করবেন
- রোগীকে বসিয়ে বা শুইয়ে শান্ত রাখুন।
- দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করবেন না।
- যত দ্রুত সম্ভব ECG করান।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে হৃদ্পেশির ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ECG কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ECG বা Electrocardiogram হলো হার্টের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরীক্ষা করার একটি সহজ ও দ্রুত পদ্ধতি।
হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে এটি প্রথম পরীক্ষা হিসেবে করা হয়।
ECG-এর মাধ্যমে—
- হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বোঝা যায়।
- ST-segment Elevation আছে কি না জানা যায়।
- পরবর্তী চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
অনেক সময় ECG স্বাভাবিক হলেও চিকিৎসক প্রয়োজনে Troponin Test, Echocardiography বা Coronary Angiography করার পরামর্শ দিতে পারেন।
হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা কীভাবে হয়?
বর্তমানে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা আগের তুলনায় অনেক উন্নত।
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, ECG রিপোর্ট এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়ের উপর।
প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকেরা সাধারণত—
- রক্ত জমাট বাঁধা কমানোর ওষুধ
- অ্যান্টিপ্লেটলেট ওষুধ
- কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ
- প্রয়োজনে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ
দিয়ে থাকেন।
এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী Angiography ও Angioplasty করা হয়।
অ্যানজিওপ্লাস্টি কী?
অ্যানজিওপ্লাস্টি হলো এমন একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে হার্টের ব্লক হওয়া ধমনী খুলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
এ সময় একটি ক্ষুদ্র বেলুন ও স্টেন্ট ব্যবহার করে ব্লক হওয়া অংশটি প্রসারিত করা হয়।
বর্তমানে অধিকাংশ Acute Heart Attack রোগীর ক্ষেত্রে এটি সর্বাধিক কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত।
যদি রোগী এমন এলাকায় থাকেন যেখানে Cath Lab নেই, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী Thrombolytic Therapy ব্যবহার করা হতে পারে।
অ্যানজিওপ্লাস্টির পর কী কী মেনে চলতে হবে?
অনেকেই মনে করেন অ্যানজিওপ্লাস্টি হয়ে গেলে রোগ সম্পূর্ণ সেরে যায়। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়।
অ্যানজিওপ্লাস্টি হৃদ্রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, কিন্তু ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে রোগীকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন মেনে চলতে হয়।
অ্যানজিওপ্লাস্টির পর সাধারণত—
- নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে।
- চিকিৎসকের ফলো-আপে থাকতে হবে।
- ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
- রক্তচাপ, সুগার ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে হবে।
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করতে হবে।
এই নিয়মগুলো মেনে চললে পুনরায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে।


