কানের নানা সমস্যা, কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ ও কম শোনা: কারণ, সতর্কতা ও আধুনিক চিকিৎসা

কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ, কানের ইনফেকশন ও Hearing Loss সম্পর্কে ডঃ রাজদীপ গুহের পরামর্শ

কানে ভোঁ-ভোঁ বা শোঁ-শোঁ শব্দ, কান বন্ধ হয়ে যাওয়া, কানে ব্যথা, বারবার ইনফেকশন কিংবা ধীরে ধীরে কম শোনা—এই সমস্যাগুলিকে অনেকেই সামান্য সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এগুলি কানের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

বিশেষ করে বর্তমানে হেডফোন ও ইয়ারফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, উচ্চ শব্দের সংস্পর্শ, কানে কটন বাড দিয়ে খোঁচাখুঁচি এবং কানের সংক্রমণের কারণে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে কিছু ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

এই প্রতিবেদনে কানের বিভিন্ন সাধারণ সমস্যা, Tinnitus বা কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ, কানের ইনফেকশন, কানের পর্দা ফুটো, Hearing Loss এবং আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করা হল। বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন নারায়ণা সুপার স্পেশালিটি হসপিটালের ENT সার্জন ডঃ রাজদীপ গুহ


হেডফোন ও ইয়ারফোন কি কানের ক্ষতি করতে পারে?

হেডফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহার নিজে থেকেই ক্ষতিকর নয়। সমস্যা তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত ভলিউমে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করলে

বিশেষ করে মেট্রো, বাস, রাস্তা বা অন্য কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে বাইরের শব্দকে ছাপিয়ে যাওয়ার জন্য অনেকেই হেডফোনের ভলিউম বাড়িয়ে দেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে উচ্চ শব্দ শুনতে থাকলে কানের সংবেদনশীল শ্রবণতন্ত্রের ওপর চাপ পড়তে পারে।

অতিরিক্ত শব্দে কী সমস্যা হতে পারে?

Acoustic Fatigue:
দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত শব্দে থাকার পরে সাময়িকভাবে কান ভার লাগতে পারে, কম শুনতে পারে অথবা কানে শোঁ-শোঁ শব্দ হতে পারে।

Permanent Hearing Loss:
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শব্দের সংস্পর্শে থাকলে কানের অভ্যন্তরের সংবেদনশীল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি কমে যেতে পারে।

তাই হেডফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভলিউম এবং ব্যবহারের সময়—দুটির দিকেই নজর দেওয়া জরুরি।


কানে ভোঁ-ভোঁ বা শোঁ-শোঁ শব্দ কেন হয়?

চারপাশে কোনো শব্দ না থাকা সত্ত্বেও কানে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, ঘণ্টার মতো শব্দ, সাই-সাই বা ভোঁ-ভোঁ আওয়াজ শোনা গেলে তাকে Tinnitus বা টিনিটাস বলা হয়।

অনেকের ক্ষেত্রে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়, যখন চারপাশ একেবারে শান্ত থাকে, তখন এই শব্দ বেশি স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।

Tinnitus-এর সম্ভাব্য কারণ

কানের অভ্যন্তরের শ্রবণ-স্নায়ুর ক্ষতি বা শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সঙ্গে Tinnitus-এর সম্পর্ক থাকতে পারে। ফাইলের আলোচনাতেও অভ্যন্তরীণ নার্ভের ক্ষতি এবং আংশিক শ্রবণশক্তি কমে যাওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

Tinnitus কি পুরোপুরি ভালো হয়?

Tinnitus-এর চিকিৎসা এর কারণের ওপর নির্ভর করে। ফাইলে Tinnitus Retraining Therapy (TRT), White Noise, হালকা মিউজিক মাস্কিং এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই দীর্ঘদিন ধরে কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ হলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে একজন ENT বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


কানের ইনফেকশন কত ধরনের?

কানের কোন অংশে সংক্রমণ হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে কানের ইনফেকশন বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। আলোচনায় প্রধানত তিন ধরনের সংক্রমণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১. Otitis Externa

এটি কানের বাইরের অংশের সংক্রমণ। ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের কারণে এটি হতে পারে।

কানে খোঁচাখুঁচি করা কিংবা অপরিষ্কার জল কানে ঢোকার মতো বিষয় এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তীব্র কান ব্যথা এবং কান বন্ধ লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

২. Otitis Media

মধ্যকর্ণের সংক্রমণকে Otitis Media বলা হয়।

নাক ও কানের মধ্যে সংযোগকারী Eustachian Tube-এ সমস্যা বা ব্লক তৈরি হলে কানের পর্দার পেছনে তরল বা সর্দি জমতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সর্দি-কাশির পর রাতে হঠাৎ তীব্র কান ব্যথা দেখা দিতে পারে।

৩. Labyrinthitis

কানের ভেতরের অংশে সংক্রমণ হলে তাকে Labyrinthitis বলা হয়। এটি তুলনামূলকভাবে গুরুতর সমস্যা এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। ফাইলে এ ধরনের সংক্রমণের গুরুতর জটিলতার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।


কানে জল ঢুকলে কী করবেন?

স্নান বা সাঁতার কাটার সময় কানে জল ঢুকে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। তবে কানের ভেতর থেকে জল বের করার জন্য ভুল পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত নয়।

কানে জল ঢুকলে মাথা একদিকে কাত করে বা হালকা ঝাঁকিয়ে জল বের করার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু কটন বাড, দেশলাই কাঠি বা অন্য কোনো ধারালো জিনিস কানের ভেতরে ঢোকানো উচিত নয়


কটন বাড দিয়ে কান পরিষ্কার করা কি নিরাপদ?

কানের ভেতরে কটন বাড দিয়ে বারবার পরিষ্কার করার অভ্যাস অনেকের রয়েছে। কিন্তু এটি বিপজ্জনক হতে পারে।

কটন বাড বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে কানের ভেতরে খোঁচাখুঁচি করলে—

  • কানের ভেতরের ত্বকে আঘাত লাগতে পারে
  • ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়তে পারে
  • কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
  • কানের পর্দা ফুটো হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে

ফাইলে কটন বাড বা দেশলাই কাঠি দিয়ে কানে খোঁচাখুঁচি না করার বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে।


কানের পর্দা ফুটো হলে কী হতে পারে?

কানের পর্দা ফুটো হওয়া বা perforation-এর কারণে কানে বারবার ইনফেকশন, পুঁজ পড়া এবং শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে কানের ভেতরের ছোট ছোট হাড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা থাকলে ENT বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কানের আধুনিক Microsurgery কী?

কানের পর্দা ফুটো হওয়া, কানের ভেতরের হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা বারবার কান দিয়ে পুঁজ পড়ার মতো সমস্যার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে Ear Microsurgery করা হতে পারে।

ফাইলে আধুনিক মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে কানের মাইক্রোসার্জারির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কানের ক্ষুদ্র হাড় নষ্ট হলে কি শ্রবণশক্তি ফিরতে পারে?

কানের মধ্যবর্তী অংশে থাকা ক্ষুদ্র হাড়গুলি সংক্রমণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্রবণশক্তিতে সমস্যা হতে পারে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে Ossicular Prosthesis বা কৃত্রিম অসিকেল ব্যবহার করে শ্রবণতন্ত্র পুনর্গঠনের চেষ্টা করা যেতে পারে।

অপারেশনের প্রয়োজন আছে কি না এবং কোন ধরনের সার্জারি উপযুক্ত—তা রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর নির্ভর করে।


কম শুনলে কি Hearing Aid ব্যবহার করতে লজ্জা পাওয়া উচিত?

একেবারেই নয়।

যেমন চোখের দৃষ্টিশক্তি কমলে চশমা ব্যবহার করা স্বাভাবিক, তেমনই শ্রবণশক্তি কমে গেলে প্রয়োজনে Hearing Aid ব্যবহার করাও স্বাভাবিক চিকিৎসা-সহায়ক ব্যবস্থা।

বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ছোট ও উন্নত Hearing Aid পাওয়া যায়। কিছু ডিভাইস কানের ভেতরে এমনভাবে ব্যবহার করা যায় যে বাইরে থেকে তা সহজে বোঝাও যায় না।

সঠিকভাবে ব্যবহার করলে Hearing Aid অনেক মানুষকে দৈনন্দিন যোগাযোগ ও সামাজিক জীবনে আরও স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করতে পারে।


কানের যত্নে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

১. হেডফোনের ভলিউম কম রাখুন

দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ ভলিউমে গান বা অন্য অডিও শোনা এড়িয়ে চলুন। ফাইলে 60/60 rule অনুসরণের কথা বলা হয়েছে—প্রায় ৬০% ভলিউমে সর্বোচ্চ ৬০ মিনিট ব্যবহারের পর বিরতি নেওয়া।

২. কানে কটন বাড ঢোকাবেন না

কান পরিষ্কার করার নামে কানের ভেতরে কোনো বস্তু ঢোকাবেন না।

৩. নিজের মতো করে Ear Drop ব্যবহার করবেন না

দোকান থেকে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক বা Ear Drop কিনে ব্যবহার করা ঠিক নয়। কিছু ওষুধ কানের জন্য ক্ষতিকর বা Ototoxic হতে পারে।

৪. কানে জল ঢোকার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন

বিশেষ করে যদি আগে থেকেই কানের পর্দায় সমস্যা বা ইনফেকশন থাকে, তাহলে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

৫. দীর্ঘদিন কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ হলে পরীক্ষা করান

Tinnitus বারবার হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।

৬. কম শুনলে দ্রুত ENT বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন

কানে জল পড়া, তীব্র ব্যথা বা হঠাৎ/ক্রমশ কম শোনার মতো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


কখন দ্রুত ENT বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো সমস্যা থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো—

  • হঠাৎ কম শুনতে শুরু করা
  • দীর্ঘদিন ধরে কানে ভোঁ-ভোঁ বা শোঁ-শোঁ শব্দ
  • কানে তীব্র ব্যথা
  • কান দিয়ে পুঁজ বা তরল পড়া
  • কানে বারবার ইনফেকশন হওয়া
  • কানের পর্দা ফুটো হওয়ার সন্দেহ
  • মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যের সমস্যা
  • কানের সমস্যার সঙ্গে জ্বর বা গুরুতর অসুস্থতা

বিশেষ করে হঠাৎ শ্রবণশক্তি কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


উপসংহার

কানের সমস্যা ছোট বলে অবহেলা করা উচিত নয়। হেডফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে শুরু করে কানে কটন বাড দিয়ে খোঁচাখুঁচি, ইনফেকশন, Tinnitus কিংবা কানের পর্দার সমস্যার—প্রতিটির ক্ষেত্রেই সঠিক কারণ নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে ভালো উপায় হল কানের সমস্যা হলে নিজের মতো করে ওষুধ বা Ear Drop ব্যবহার না করে ENT বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে অনেক সমস্যারই কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।

ডঃ রাজদীপ গুহের আলোচনায় কানের এই সমস্যাগুলির পাশাপাশি আধুনিক Ear Microsurgery এবং Hearing Aid-এর মতো চিকিৎসা-সহায়ক ব্যবস্থার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।

আপনার কানে যদি দীর্ঘদিন ধরে ভোঁ-ভোঁ শব্দ, ব্যথা, ইনফেকশন বা কম শোনার সমস্যা থাকে, তাহলে দেরি না করে একজন যোগ্য ENT বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন


Frequently Asked Questions (FAQ)

কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ হওয়াকে কী বলে?

কানে কোনো বাহ্যিক শব্দ না থাকা সত্ত্বেও ভোঁ-ভোঁ, শোঁ-শোঁ, ঘণ্টা বা ঝিঁঝিঁ পোকার মতো শব্দ শোনাকে Tinnitus বলা হয়।

হেডফোন কি শ্রবণশক্তি নষ্ট করতে পারে?

অতিরিক্ত ভলিউমে দীর্ঘ সময় হেডফোন ব্যবহারের ফলে শ্রবণতন্ত্রের ক্ষতি এবং স্থায়ী Hearing Loss-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কানে কটন বাড ব্যবহার করা উচিত?

কানের ভেতরে কটন বাড বা অন্য কোনো বস্তু ঢুকিয়ে পরিষ্কার করা উচিত নয়। এতে কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কানের পর্দা ফুটো হলে কি চিকিৎসা সম্ভব?

কিছু ক্ষেত্রে কানের পর্দা ও মধ্যকর্ণের সমস্যার জন্য Microsurgery প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন ENT বিশেষজ্ঞ।

কম শুনলে কি Hearing Aid ব্যবহার করা উচিত?

শ্রবণশক্তি কমে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী Hearing Aid ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ছোট ও উন্নত Hearing Aid পাওয়া যায়।