ডিমের চেয়েও বেশি প্রোটিন আছে যে ১০ খাবারে, তালিকায় চমকে দেবে কয়েকটি নাম

ডিমের চেয়ে বেশি প্রোটিনযুক্ত ১০ খাবার

প্রোটিনের কথা উঠলেই প্রথম সারিতে আসে ডিমের নাম। সহজলভ্য, তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং শরীরের প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডসমৃদ্ধ হওয়ায় ডিমকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রোটিনের অন্যতম ভালো উৎস হিসেবে ধরা হয়। একটি ডিমে সাধারণত প্রায় ৬-৭ গ্রাম প্রোটিন থাকে।

তবে শুধু ডিমই যে প্রোটিনের একমাত্র ভালো উৎস, তা নয়। মাংস, মাছ, দুগ্ধজাত খাবার, ডাল, বাদাম ও বিভিন্ন বীজেও প্রচুর প্রোটিন রয়েছে। এর পাশাপাশি এসব খাবার থেকে শরীর পেতে পারে ফাইবার, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান।

অর্থাৎ, প্রতিদিনের খাবারে একাধিক উৎস থেকে প্রোটিন যোগ করলে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা সম্ভব। এটি পেশি গঠনে, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে এবং সামগ্রিকভাবে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।

চলুন দেখে নেওয়া যাক, ডিম ছাড়াও কোন ১০টি খাবারকে উচ্চ-প্রোটিনের উৎস হিসেবে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

১. গ্রিক দই

গ্রিক দই শুধু সুস্বাদু নয়, এটি প্রোটিনেরও ভালো উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম গ্রিক দইয়ে প্রায় ১০ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে, যা ডিমের তুলনায় বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এতে প্রোবায়োটিকও রয়েছে, যা হজমের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

খাবেন কীভাবে?
সকালের খাবার, ফলের সঙ্গে অথবা হালকা জলখাবার হিসেবে গ্রিক দই খেতে পারেন।


২. মসুর ডাল

নিরামিষভোজীদের জন্য মসুর ডাল প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। রান্না করা ১০০ গ্রাম মসুর ডালে প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে।

প্রোটিনের পাশাপাশি মসুর ডালে রয়েছে ফাইবার, আয়রন ও জটিল কার্বোহাইড্রেট। ফলে এটি প্রতিদিনের সুষম খাদ্যতালিকায় সহজেই জায়গা করে নিতে পারে।

খাবেন কীভাবে?
ডাল, স্যুপ বা বিভিন্ন সবজির সঙ্গে মসুর ডাল খেতে পারেন।


৩. চিকেন ব্রেস্ট

যারা প্রাণিজ উৎস থেকে প্রোটিন গ্রহণ করেন, তাদের জন্য চিকেন ব্রেস্ট অত্যন্ত সমৃদ্ধ প্রোটিনের উৎস।

প্রতি ১০০ গ্রাম চিকেন ব্রেস্টে প্রায় ৩১ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে। পাশাপাশি এতে ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় উচ্চ-প্রোটিন খাদ্যতালিকায় এটি জনপ্রিয়।

খাবেন কীভাবে?
গ্রিল, সেদ্ধ বা হালকা রান্না করে চিকেন ব্রেস্ট খেতে পারেন।


৪. কটেজ চিজ

কটেজ চিজও প্রোটিনের একটি ভালো উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম কটেজ চিজে প্রায় ১১ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে।

এতে কেসিন প্রোটিনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। কেসিন তুলনামূলক ধীরে হজম হয় এবং পেশির পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।

খাবেন কীভাবে?
সালাদ, স্যান্ডউইচ বা হালকা জলখাবারে কটেজ চিজ যোগ করা যেতে পারে।


৫. ছোলা

ছোলা আমাদের পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত একটি ডালজাতীয় খাবার। রান্না করা প্রতি ১০০ গ্রাম ছোলায় প্রায় ৮-৯ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে।

প্রোটিনের পাশাপাশি ছোলায় রয়েছে ফাইবার, যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সহায়তা করতে পারে। হুমাসসহ বিভিন্ন খাবার তৈরিতেও ছোলা ব্যবহার করা হয়।

খাবেন কীভাবে?
সেদ্ধ ছোলা, সালাদ, তরকারি বা হুমাস হিসেবে খেতে পারেন।


৬. টোফু

টোফু সয়া থেকে তৈরি একটি জনপ্রিয় খাবার এবং নিরামিষভোজীদের জন্য প্রোটিনের ভালো উৎস হতে পারে।

প্রতি ১০০ গ্রাম টোফুতে প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এটিকে সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এতে শরীরের প্রয়োজনীয় সব অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড রয়েছে।

খাবেন কীভাবে?
সবজি দিয়ে রান্না, স্যুপ, সালাদ বা হালকা ভাজা করে টোফু খেতে পারেন।


৭. টুনা মাছ

মাছের মধ্যে টুনা প্রোটিনের অত্যন্ত সমৃদ্ধ উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম টুনা মাছে প্রায় ২৯ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে।

এর পাশাপাশি টুনায় রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

খাবেন কীভাবে?
গ্রিল বা রান্না করা টুনা সালাদ কিংবা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে খেতে পারেন।


৮. কুইনোয়া

কুইনোয়া উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রোটিন পাওয়ার একটি জনপ্রিয় উপায়। রান্না করা এক কাপ কুইনোয়ায় প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে।

এটিকে সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস হিসেবে ধরা হয়, কারণ এতে শরীরের প্রয়োজনীয় নয়টি অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড রয়েছে।

খাবেন কীভাবে?
ভাতের বিকল্প হিসেবে, সালাদে অথবা সবজির সঙ্গে কুইনোয়া খেতে পারেন।


৯. বাদাম

বাদাম শুধু স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের উৎস নয়, এতে যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটিনও রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম বাদামে প্রায় ২১ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে।

প্রোটিনের পাশাপাশি বাদামে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও ভিটামিন E। তাই পরিমিত পরিমাণে বাদাম স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।

খাবেন কীভাবে?
পরিমিত পরিমাণে বাদাম জলখাবার হিসেবে বা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে খেতে পারেন।


১০. কুমড়োর বীজ

ছোট হলেও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ কুমড়োর বীজ। প্রতি ১০০ গ্রাম কুমড়োর বীজে প্রায় ১৯ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে।

এতে প্রোটিনের পাশাপাশি ম্যাগনেশিয়াম, জিঙ্ক এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে।

খাবেন কীভাবে?
পরিমিত পরিমাণে কুমড়োর বীজ সরাসরি জলখাবার হিসেবে অথবা সালাদ, দই ও অন্যান্য খাবারের সঙ্গে যোগ করে খেতে পারেন।


এক নজরে ১০টি উচ্চ-প্রোটিন খাবার

খাবারউল্লেখযোগ্য প্রোটিন
গ্রিক দইপ্রায় ১০ গ্রাম/১০০ গ্রাম
মসুর ডালপ্রায় ৯ গ্রাম/১০০ গ্রাম রান্না করা
চিকেন ব্রেস্টপ্রায় ৩১ গ্রাম/১০০ গ্রাম
কটেজ চিজপ্রায় ১১ গ্রাম/১০০ গ্রাম
ছোলাপ্রায় ৮-৯ গ্রাম/১০০ গ্রাম রান্না করা
টোফুপ্রায় ৮ গ্রাম/১০০ গ্রাম
টুনাপ্রায় ২৯ গ্রাম/১০০ গ্রাম
কুইনোয়াপ্রায় ৮ গ্রাম/রান্না করা ১ কাপ
বাদামপ্রায় ২১ গ্রাম/১০০ গ্রাম
কুমড়োর বীজপ্রায় ১৯ গ্রাম/১০০ গ্রাম

শুধু ডিমের ওপর নির্ভর না করে প্রোটিনের উৎসে বৈচিত্র্য আনুন

ডিম নিঃসন্দেহে পুষ্টিকর ও সুবিধাজনক প্রোটিনের উৎস। তবে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের একাধিক উৎস রাখলে খাবারে বৈচিত্র্য আসে।

প্রাণিজ খাবারের পাশাপাশি মসুর ডাল, ছোলা, টোফু, কুইনোয়া, বাদাম ও বিভিন্ন বীজের মতো উদ্ভিজ্জ উৎস থেকেও প্রোটিন পাওয়া যায়।

একই সঙ্গে বিভিন্ন খাবার থেকে শরীর পেতে পারে ফাইবার, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান।

প্রোটিন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্রোটিন শরীরের গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানগুলোর একটি। পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ পেশি গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রাখে। উচ্চ-প্রোটিন খাবার দীর্ঘসময় পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করতে পারে।

তাই প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিনের বিভিন্ন উৎস রাখা একটি সুষম খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

ডিমের চেয়ে বেশি প্রোটিন কোন খাবারে আছে?

চিকেন ব্রেস্ট ও টুনার মতো খাবারে প্রতি ১০০ গ্রামে ডিমের একটি পরিবেশনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি প্রোটিন থাকতে পারে। এছাড়া বাদাম, কুমড়োর বীজ, কটেজ চিজ ও গ্রিক দইও ভালো প্রোটিনের উৎস।

নিরামিষভোজীরা কীভাবে বেশি প্রোটিন পাবেন?

মসুর ডাল, ছোলা, টোফু, কুইনোয়া, বাদাম ও কুমড়োর বীজের মতো উদ্ভিজ্জ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

কুমড়োর বীজে কি প্রোটিন আছে?

হ্যাঁ। প্রতি ১০০ গ্রাম কুমড়োর বীজে প্রায় ১৯ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে। এতে ম্যাগনেশিয়াম, জিঙ্ক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে।

বাদামে কতটা প্রোটিন থাকে?

প্রতি ১০০ গ্রাম বাদামে প্রায় ২১ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে। পাশাপাশি বাদামে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও ভিটামিন E রয়েছে।

কুইনোয়া কি সম্পূর্ণ প্রোটিন?

কুইনোয়াকে সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এতে নয়টি অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড রয়েছে।

শেষ কথা

ডিম প্রোটিনের একটি পরিচিত ও পুষ্টিকর উৎস হলেও প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিন পাওয়ার জন্য শুধু ডিমের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। গ্রিক দই, মসুর ডাল, চিকেন ব্রেস্ট, কটেজ চিজ, ছোলা, টোফু, টুনা, কুইনোয়া, বাদাম এবং কুমড়োর বীজ—সবই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিতে পারে।

আপনার খাদ্যাভ্যাস, বয়স, শারীরিক সক্রিয়তা ও ব্যক্তিগত পুষ্টির প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিনের উৎস বেছে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। বিভিন্ন ধরনের খাবার মিলিয়ে সুষম খাদ্যতালিকা তৈরি করলে একই সঙ্গে নানা ধরনের পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত নোট: এই নিবন্ধটি সাধারণ পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে। বিশেষ কোনো রোগ, কিডনি বা লিভারের সমস্যা, অথবা নির্দিষ্ট খাদ্য-নিয়ন্ত্রণ থাকলে ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকার জন্য চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।