প্যানক্রিয়াটাইটিস কী? কেন হয় এই সমস্যা এবং কোন লক্ষণগুলো এড়িয়ে চলা বিপজ্জনক?

প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগের লক্ষণ, পেটে তীব্র যন্ত্রণা এবং অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ

পেটের ওপরের অংশে হঠাৎ তীব্র অসহ্য যন্ত্রণা—এমন ব্যথা যা হয়তো জীবনে আগে কখনো অনুভব করেননি। অনেকেই একে সাধারণ গ্যাস-অম্বল ভেবে ভুল করেন বা সময়মতো গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এই ধরনের তীব্র অস্বস্তি অগ্ন্যাশয়ের মারাত্মক সমস্যা, অর্থাৎ প্যানক্রিয়াটাইটিস (Pancreatitis)-এর ইঙ্গিত হতে পারে।

বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার অনিয়ম, খাদ্যাভ্যাস কিংবা শরীরের অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রকোপ ক্রমশ বাড়ছে। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক প্যানক্রিয়াটাইটিস আসলে কী, এর কারণ এবং কোন কোন সতর্কবার্তা দেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

প্যানক্রিয়াটাইটিস আসলে কী?

মেডিকেল বিজ্ঞানে নামের শেষে ‘আইটিস’ (itis) থাকার অর্থ হলো প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন। আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াসে যখন কোনো প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন সৃষ্টি হয়, তখন তাকে প্যানক্রিয়াটাইটিস বলা হয়।

প্রধানত এটি দুই ধরণের হয়ে থাকে:

  1. অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস (Acute Pancreatitis): স্বাভাবিক অবস্থায় থাকা অগ্ন্যাশয়ে হঠাৎ কোনো আঘাত বা ক্ষতিজনিত কারণে আকস্মিক যে প্রদাহ শুরু হয়, তাকে অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস বলে।
  2. ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস (Chronic Pancreatitis): যখন এই প্রদাহ বারবার হতে থাকে এবং টানা দীর্ঘ সময় ধরে (সাধারণত ৬ মাসের বেশি) পেটের ব্যথা বা সমস্যা চলতে থাকে, তখন তা ক্রনিক রূপ ধারণ করে। বারবার অ্যাকিউট অ্যাটাক থেকেও ধীরে ধীরে ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের দিকে পরিস্থিতি গড়াতে পারে।

প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রধান কারণ ও ঝুঁকিসমূহ

প্যানক্রিয়াটাইটিস হওয়ার পেছনে একাধিক ফ্যাক্টর কাজ করতে পারে। তবে এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণগুলো হলো:

১. গলস্টোন বা পিত্তথলির পাথর

পিত্তথলির পাথর বা গলস্টোন প্যানক্রিয়াটাইটিসের অন্যতম বড় কারণ। পিত্তনালী এবং অগ্ন্যাশয়ের রস বেরোনোর পথটি এক জায়গায় এসে ক্ষুদ্রান্ত্রে মেশে। অনেক সময় পিত্তথলির পাথর সেখান থেকে সরে এসে পিত্তনালীর মুখে আটকে যায়। ফলে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা বা অবস্ট্রাকশন তৈরি হয় এবং অগ্ন্যাশয়ে মারাত্মক চাপ পড়ে তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাথর নিজে থেকে নেমে গেলেও অগ্ন্যাশয়ে যে আঘাত লাগে, তা থেকেই অ্যাকিউট গলস্টোন প্যানক্রিয়াটাইটিস দেখা দেয়।

২. অতিরিক্ত মদ্যপান

অ্যালকোহল প্যানক্রিয়াটাইটিসের আরেকটি বড় অনুঘটক। তবে লিভারের ক্ষেত্রে যেমন মদ্যপানের নির্দিষ্ট মাত্রার ওপর ঝুঁকির হিসেব করা যায়, অগ্ন্যাশয়ের ক্ষেত্রে কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বা নিরাপদ সীমা নেই। কারও ক্ষেত্রে বছরের পর বছর বেশি পরিমাণে খাওয়ার পরও সমস্যা না হলেও, কারও হয়তো সামান্য মদ্যপানেই হঠাৎ জটিল অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস দেখা দিতে পারে।

৩. বংশগত বা জেনেটিক মিউটেশন

যাদের জন্মগতভাবে কিছু নির্দিষ্ট জিন মিউটেশন থাকে, তাদের অগ্ন্যাশয় তুলনামূলক দুর্বল বা সংবেদনশীল হতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে সাধারণ কারণ ছাড়াও জিনগত কারণে হঠাৎ বা বারবার প্রদাহ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

৪. টিউমার বা অবস্ট্রাকশন

যদি কোনো ব্যক্তির বয়স ৫০ বছরের বেশি হয় এবং তাঁর অতীতে কখনো পিত্তথলির পাথর বা মদ্যপানের ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ প্রথমবার অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়, তবে তা কোনো অভ্যন্তরীণ টিউমার বা ব্লকেজের ইঙ্গিত হতে পারে। অগ্ন্যাশয়ের নালীতে কোনো টিউমার চাপ সৃষ্টি করলে এমনটি ঘটতে পারে।

কোন লক্ষণগুলো দেখলে অবিলম্বে সতর্ক হবেন?

প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে প্রধান ও স্পষ্ট লক্ষণ হলো তীব্র ব্যথা। এই যন্ত্রণার তীব্রতা এতটাই বেশি হয় যে তা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।

  • অসহ্য পেটে ব্যথা: পেটের ওপরের দিকে শুরু হয়ে এই তীব্র যন্ত্রণা ধীরে ধীরে পিঠের দিকে ছড়িয়ে যায়।
  • প্রচণ্ড বমি ও বমি বমি ভাব: ব্যথার সাথে সাথে ঘন ঘন বমি হওয়া অত্যন্ত সাধারণ।
  • খিদে পুরোপুরি চলে যাওয়া: স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়ার ইচ্ছা একদম নষ্ট হয়ে যায়।
  • পেট ফেঁপে যাওয়া: পেট ভারী হয়ে ফুলে ওঠে এবং অনেক সময় স্বাভাবিক মলত্যাগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
  • অস্থিরতা: যন্ত্রণার তীব্রতায় রোগী ছটফট করতে থাকেন।

ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে এই ব্যথা বারবার ফিরে আসে। যদিও বারবার যন্ত্রণার শিকার হতে হতে রোগীর সহ্যক্ষমতা কিছুটা বাড়তে দেখা যায় এবং অনেকেই তখন ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে চেপে রাখার চেষ্টা করেন, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

কেন এই সমস্যা ফেলে রাখা উচিত নয়?

প্যানক্রিয়াটাইটিস নিজে থেকে সেরে গেছে মনে করে গুরুত্ব না দেওয়া বড় ভুল হতে পারে।

  • দীর্ঘদিনের ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের কারণে ক্রমাগত প্রদাহ চলতে থাকলে অগ্ন্যাশয়ের কোষে মিউটেশন ঘটে তা ম্যালিগন্যান্সি বা ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • পিত্তথলির পাথরের কারণে যদি একবারও পেটে ছটফট করা তীব্র ব্যথা হয়ে থাকে, তবে ইউএসজি (USG) বা উপযুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে অবিলম্বে পাথরের অবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। পাথর সাইলেন্ট থাকলে ঝুঁকি কম হতে পারে, কিন্তু ব্যথার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা অপরিহার্য।

সুস্থ থাকতে করণীয়

  • নিয়মমাফিক খাদ্যাভ্যাস: সকালের প্রাতঃরাশ কখনোই বাদ দেবেন না। অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত বা চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করে সুষম ও হালকা খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন।
  • পর্যাপ্ত জল পান: শরীরকে আর্দ্র রাখতে সারা দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ জল পান করুন। ডিহাইড্রেশন যেকোনো প্রদাহের অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
  • অ্যালকোহল বর্জন: অগ্ন্যাশয়কে সুরক্ষিত রাখতে মদ্যপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা শ্রেয়।
  • পেটের যন্ত্রণাকে অবহেলা নয়: বিশেষ করে পেটের উপরের অংশে এমন কোনো তীব্র ব্যথা হলে যা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সাধারণ অ্যান্টাসিড বা ব্যথানাশক খেয়ে বসে না থেকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যান বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।