মানবদেহের প্রধান ফিল্টার বা ছাঁকনি হলো কিডনি। শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে দেওয়া, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা এবং জল ও খনিজের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কিডনির ভূমিকা অপরিসীম। তবে বর্তমান সময়ে অনিয়মিত জীবনযাপন ও নানা শারীরিক জটিলতার কারণে কিডনি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কিডনির সমস্যা মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:
- অ্যাকিউট কিডনি ডিজিজ (AKD): যেখানে কিডনির কার্যক্ষমতা হঠাৎ করে কমে যায়।
- ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD): যেখানে ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় ধরে কিডনির ক্ষতি হতে থাকে এবং অঙ্গটি সংকুচিত (shrink) হয়ে পড়ে।
সঠিক সময়ে লক্ষণ চিনতে পারলে কিডনিকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক কিডনির সমস্যার কারণ, লক্ষণ ও সমাধানের নানা দিক।
কিডনি সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
কিডনির কার্যকারিতা কমতে শুরু করলে শরীরে কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:
- শরীরে জল জমা বা ফোলা ভাব (Edema): সকালে ঘুম থেকে উঠলে চোখের চারপাশ বা পুরো মুখ অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া। তবে বেলার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ফোলা ভাব কিছুটা কমে যেতে পারে। এছাড়া গোড়ালি বা পা ফুলে যাওয়াও কিডনির অন্যতম সাধারণ সংকেত।
- রক্তের রিপোর্টে পরিবর্তন: রক্ত পরীক্ষায় ইউরিয়া (Urea) ও ক্রিয়েটিনিন (Creatinine)-এর মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া।
- হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি ও রক্তাল্পতা (Anemia): রক্তে হিমোগ্লোবিন ও ফেরিটিনিনের মাত্রা কমে গিয়ে তীব্র দুর্বলতা ও ক্লান্তি দেখা দেওয়া।
- কোমরে ও পিঠের নিচের দিকে ব্যথা: কোমরে একটানা ব্যথা হওয়া, যা অনেক সময় সায়াটিকার ব্যথার মতো পায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
- প্রস্রাবের সমস্যা: প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণে (UTI) ভোগা।
অ্যাকিউট কিডনি রোগের প্রধান কারণ
হঠাৎ করে কিডনি অকেজো হওয়ার পেছনে সাধারণত বেশ কিছু আকস্মিক শারীরিক পরিবর্তন দায়ী থাকে:
- তীব্র ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন: তীব্র পাতলা পায়খানা হলে শরীর থেকে দ্রুত জল বেরিয়ে যায়। সময়মতো সঠিক নিয়মে ওআরএস (ORS) ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ না করলে শরীর পানিশূন্য হয়ে কিডনিতে হঠাৎ আঘাত লাগে।
- অতিরিক্ত রক্তপাত: মহিলাদের ক্ষেত্রে জরায়ুর ফাইব্রয়েড (Uterine Fibroid) বা অন্য কোনো কারণে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে রক্তাল্পতা তৈরি হয়, যা কিডনিকে ঝুঁকিতে ফেলে।
- হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়া: রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে নেমে গেলে কিডনিতে রক্ত চলাচলের গতি কমে যায় এবং রক্তনালীতে ব্লকেজ বা চাপ তৈরি হয়ে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- অ্যালকোহল ও অনিয়ন্ত্রিত লিপিড: অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে লিপিড প্রোফাইল অস্বাভাবিক হয়ে রক্তনালীর ভেতর রক্ত চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে কিডনিতে ধাক্কা দিতে পারে।
ক্রনিক কিডনি ডিজিজ ও তার যত্ন
বয়স বৃদ্ধি, দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা ক্যান্সারের মতো মারণ রোগের জটিলতা থেকে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ দেখা দিতে পারে।
ক্রনিক কিডনি রোগে কিডনির ভেতরের গঠন বা টিস্যু স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নিয়মিত চিকিৎসা, শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল নিষ্কাশন (Diuresis) এবং হিমোগ্লোবিনের মাত্রা সঠিক রাখার মাধ্যমে রোগীকে দীর্ঘদিন ভালো ও সচল রাখা সম্ভব।
রোগের তীব্র পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় ডায়ালিসিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি সহায়ক চিকিৎসায় রোগীর প্রস্রাবের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, প্রোটিন নির্গমন রোধ করা এবং রক্তাল্পতা দূর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কিডনি সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন করণীয়
- পর্যাপ্ত জল পান: কিডনিকে পরিষ্কার রাখতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ জল পান করুন। তবে যাঁদের শরীরে ইতিমধ্যে জল জমছে বা কিডনির ক্রনিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণেই জল গ্রহণ করতে হবে।
- সুষম আহার ও সঠিক প্রাতঃরাশ: সকালের স্বাস্থ্যকর প্রাতঃরাশ থেকে শুরু করে সারাদিনের খাবারে অতিরিক্ত নুন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন করুন।
- ডায়রিয়াকে অবহেলা নয়: ডায়রিয়া হলে ফার্মেসি থেকে যা খুশি ওষুধ না খেয়ে শুরুতেই পর্যাপ্ত স্যালাইন ও তরল দিয়ে শরীরের ঘাটতি পূরণ করুন।
রক্তচাপ ও রক্তাল্পতা নিয়ন্ত্রণ: রক্তচাপ হঠাৎ খুব বেশি কমে গেলে বা বেড়ে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন এবং নিয়মিত রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পরীক্ষা করান।


