মানসিক সুস্থতা: অবহেলা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে সুস্থতার সন্ধান

বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং ব্যস্ত জীবনে শারীরিক সুস্থতার খবর আমরা নিয়মিত রাখলেও, মানসিক সুস্থতার (Mental Health) বিষয়টি প্রায়শই অবহেলিত থেকে যায়। আমাদের সমাজে বুকে ব্যথা বা জ্বর হলে মানুষ যেভাবে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে ছোটেন, মনের কোনো সমস্যা হলে কিন্তু তেমনটা দেখা যায় না।

এই স্ট্রেসফুল লাইফে মানসিক সুস্থতা কেন সমপরিমাণে জরুরি, তা নিয়ে সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আলোচনা করেছেন কলকাতার প্রখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট ডক্টর অর্ণব দত্ত। আসুন জেনে নিই মন ও শরীরের এই গভীর সংযোগ এবং মানসিক রোগ নিয়ে সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও আধুনিক বিজ্ঞান

ডক্টর অর্ণব দত্ত জানান, মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব কেবল আধুনিক যুগের আবিষ্কার নয়। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে এর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। চরক, সুশ্রুত এবং পতঞ্জলির মতো ঋষিদের সংহিতায় এর প্রমাণ মেলে।

মহর্ষি পতঞ্জলি স্পষ্টই বলেছিলেন— রোগকে নয়, রোগীকে চিকিৎসা করতে হবে। কারণ, অধিকাংশ রোগ প্রথমে মনে জন্ম নেয়, তারপর তা শরীরে প্রকাশ পায়।

আজকের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) এই একই কথা বলছে। ডব্লিউএইচও-এর মতে, মানুষের প্রায় ৯০ শতাংশ রোগের উৎস প্রথমে মনে তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে শরীরে নানাবিধ রোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

মন ও শরীরের আন্তঃসম্পর্ক: বাস্তব কিছু উদাহরণ

ডক্টর দত্ত বিষয়টি সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে কিছু চমৎকার এবং বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন:

১. পরীক্ষার ভীতি ও শারীরিক অসুস্থতা (Exam Anxiety)

অনেক শিক্ষার্থী অংক বা ইংরেজি পরীক্ষার আগে তীব্র মানসিক চাপে ভোগে। এই মানসিক ভয়ের কারণে পরীক্ষার দিন বা আগের দিন তাদের বমি, পেট খারাপ, হাত-পা কাঁপা বা শরীর খারাপের মতো বাস্তব শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। অথচ পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই বা চেনা প্রশ্ন সামনে এলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ করে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে সমস্যাটি শরীরের নয়, মনের ছিল।

২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি (Immunity Power)

একই ক্লাসের বা একই পরিবেশের কিছু শিশু প্রায়ই সর্দি-কাশিতে ভোগে, আবার কেউ কেউ সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে। দেখা গেছে, যে শিশুরা মানসিকভাবে চাঙ্গা ও ফুরফুরে থাকে (যার পেছনে পারিবারিক সুপরিবেশ বা মা-বাবার ভালো ব্যবহারের বড় ভূমিকা থাকে), তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি হয়। অন্যদিকে, মানসিক কষ্টে থাকা শিশুরা সহজেই রোগাক্রান্ত হয়।

৩. স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখিদের মন খারাপ

শুধু মানুষেরই নয়, কুকুর-বিড়াল বা পাখির মতো প্রাণীদের মধ্যেও মন খারাপ বা বিষণ্ণতার (Depression) লক্ষণ দেখা যায়। যেমন, ব্রিডিং বা অন্য কোনো কারণে দুটি পরিচিত কুকুরকে আলাদা করা হলে তারা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয় বা খিটখিটে হয়ে পড়ে। মন খারাপের প্রভাব তাদের শরীরেও স্পষ্ট দেখা যায়।

মানসিক রোগ নিয়ে প্রচলিত ৫টি বড় ভুল ধারণা (Taboo)

আমাদের সমাজে মানসিক রোগকে রোগ হিসেবে না দেখে, সেটিকে নিয়ে নানা রকম অলৌকিক বা মনগড়া গল্প তৈরি করা হয়। ডক্টর দত্ত এরকমই কিছু প্রচলিত ট্যাবু ও তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন:

  • হিস্টিরিয়া ও ভূতে ধরা: সমাজে এখনো অনেকে ‘কনভার্সন ডিসঅর্ডার’ বা হিস্টিরিয়াকে ‘ভূতে ধরা’ বা ‘ভর করা’ বলে ভুল করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, এটি তীব্র মানসিক চাপের একটি শারীরিক বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
  • মানসিক রোগ মানেই অভিনয়: অনেকেই মনে করেন মানসিক রোগী আসলে অভিনয়ের ভান করছেন বা অলসতা করছেন। আবার কেউ ভাবেন, “একটু মাঠে ঘুরে আসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।” এটি অত্যন্ত ভুল ধারণা।
  • অটিজম বা মেন্টাল রিটার্ডেশন: বুদ্ধি কম বা অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের অনেকে অভিশাপের ফল মনে করেন। কিন্তু এর পেছনে জিনগত কারণ, মাথায় আঘাত বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। সঠিক থেরাপির মাধ্যমে এদের অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
  • নিশীথ ডাক বা ঘুমের মধ্যে হাঁটা (Sleep Walking): রাতে একা একা কথা বলা বা ঘুমের মধ্যে হেঁটে চলে যাওয়াকে অলৌকিক কিছু ভাবা ভুল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘সিম্বলিজম’ বলা হয়, যা মূলত তীব্র মানসিক চাপ বা টেনশন থেকে তৈরি হয়।
  • নেশাগ্রস্ততা: অনেকেই মনে করেন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের আর ভালো করা সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক রিহ্যাবিলিটেশন ও মানসিক চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়।

সুস্থ হয়ে ওঠার পেছনে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা

একজন মানসিক রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার পেছনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ডক্টর দত্তের মতে, একই রোগে আক্রান্ত দুজন রোগীর মধ্যে যার পরিবার পাশে থাকে, সে যত দ্রুত সুস্থ হয়, অন্যজন ততটা পারে না।

আমাদের চারপাশে বা রাস্তায় যে সমস্ত মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই সঠিক চিকিৎসা ও যত্নে সুস্থ হতে পারেন। কিন্তু পরিবার বা সমাজের অবহেলার কারণে আজ তারা এই অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাই রোগীদের মারধর বা লুকিয়ে না রেখে, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন।

সুস্থ হওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন: কিছু জরুরি পরামর্শ

দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর একজন ব্যক্তি যখন সুস্থ হয়ে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেন, তখন সহকর্মী বা কর্তৃপক্ষের মনে তাকে নিয়ে নানা সংশয় বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে।

ডক্টর দত্তের মতে, যদি রোগী নিয়মিত ওষুধ খান এবং কাউন্সেলিংয়ের মধ্যে থাকেন, তবে তার আচরণে কোনো সমস্যা হবে না। ঠিক যেভাবে হাত ভাঙার পর প্লাস্টার কেটে মানুষ স্বাভাবিক কাজ করতে পারে, মানসিক রোগ থেকেও মানুষ একইভাবে পুরোপুরি সুস্থ হতে পারে। এই ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রের মানুষদেরও সংবেদনশীল হতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছ থেকে একটি ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে সরাসরি কথা বলা যেতে পারে।

উপসংহার

মানসিক রোগ কোনো অভিশাপ, পাপ বা লোকলজ্জার বিষয় নয়। সঠিক সময়ে সঠিক মানসিক চিকিৎসকের (Psychiatrist) পরামর্শ এবং চারপাশের মানুষের একটু সহমর্মিতাই পারে একজন মানুষকে পুনরায় একটি সুন্দর ও সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দিতে। শরীরকে ভালোবাসলে, মনকেও ভালোবাসতে হবে।