থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসায় রক্ত সঞ্চালন ও আয়রন কিলেশন থেরাপি: বিশদে জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ প্রশান্ত চৌধুরী
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত (Genetic) রক্তের রোগ, যেখানে শরীরে স্বাভাবিক পরিমাণে হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। এর ফলে শরীরে অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা কমে যায় এবং রোগী দীর্ঘমেয়াদি রক্তশূন্যতায় ভোগেন।
বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন (Blood Transfusion) এবং অতিরিক্ত আয়রন নিয়ন্ত্রণের জন্য Iron Chelation Therapy অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি ও থ্যালাসেমিয়া বিশেষজ্ঞ ডাঃ প্রশান্ত চৌধুরী।
থ্যালাসেমিয়ার বিভিন্ন ধরন
থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা অনুযায়ী সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়—
- থ্যালাসেমিয়া মাইনর
- থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া
- থ্যালাসেমিয়া মেজর
এর মধ্যে থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়।
কেন নিয়মিত রক্ত দিতে হয়?
থ্যালাসেমিয়া রোগীর শরীরে পর্যাপ্ত সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয় না।
ফলে—
- রক্তশূন্যতা বৃদ্ধি পায়
- শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়
- প্লীহা ও যকৃত বড় হয়ে যেতে পারে
- হাড়ের বিকৃতি দেখা দিতে পারে
- শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
এই কারণেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্ত সঞ্চালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রক্ত সঞ্চালনের আগে হিমোগ্লোবিন কত থাকা উচিত?
ডাঃ প্রশান্ত চৌধুরীর মতে—
২ বছরের কম বয়সী শিশু
রক্ত দেওয়ার আগে হিমোগ্লোবিন প্রায় ১০–১০.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার রাখা উচিত।
২ বছরের বেশি শিশু
রক্ত দেওয়ার আগে হিমোগ্লোবিন ৯–৯.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার থাকা আদর্শ।
সঠিক সময়ে রক্ত দিলে শিশুর বৃদ্ধি, শারীরিক বিকাশ এবং দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।
কত পরিমাণ রক্ত দেওয়া হয়?
সাধারণভাবে প্রতি কেজি ওজন অনুযায়ী প্রায় ১৫ মিলিলিটার Packed Red Blood Cell (PRBC) দেওয়া হয়।
এক ইউনিট প্যাকড রেড সেল সাধারণত হিমোগ্লোবিন প্রায় ১ থেকে ১.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার পর্যন্ত বাড়াতে সাহায্য করে।
কেন শুধুমাত্র Packed Red Cell ব্যবহার করা হয়?
বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে Packed Red Blood Cell ব্যবহার করা হয় কারণ—
- রোগীর অতিরিক্ত তরল জমার ঝুঁকি কমে
- রক্ত সঞ্চালন বেশি কার্যকর হয়
- অপ্রয়োজনীয় উপাদান কম প্রবেশ করে
এছাড়াও নিরাপদ রক্ত ব্যবহারের জন্য রক্তকে HIV, Hepatitis, Syphilis সহ বিভিন্ন সংক্রমণের জন্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে নেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শুধু ABO ও Rh গ্রুপ মিললেই যথেষ্ট নয়।
দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত রক্ত গ্রহণকারী থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে—
- Kell
- Kidd
- Duffy
- অন্যান্য Red Cell Antigen
মিলিয়ে রক্ত দেওয়া হলে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবডি তৈরির ঝুঁকি অনেক কমে যায় এবং চিকিৎসা আরও নিরাপদ হয়।
আয়রন ওভারলোড কী?
নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের ফলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমতে থাকে।
এই অতিরিক্ত আয়রন জমে—
- হৃদপিণ্ড
- যকৃত
- অন্তঃস্রাবী গ্রন্থি
- কিডনি
ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই শুধু রক্ত দিলেই চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয় না।
Iron Chelation Therapy কী?
Iron Chelation Therapy হলো এমন একটি চিকিৎসা, যার মাধ্যমে শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত আয়রন ধীরে ধীরে বের করে দেওয়া হয়।
এই চিকিৎসা থ্যালাসেমিয়া রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
থ্যালাসেমিয়ায় ব্যবহৃত প্রধান Iron Chelator
১. Deferoxamine
- ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়।
- বহু বছর ধরে ব্যবহৃত একটি কার্যকর ওষুধ।
২. Deferiprone
মুখে খাওয়ার ওষুধ।
চিকিৎসার সময় নিয়মিত Complete Blood Count (CBC) পরীক্ষা করা প্রয়োজন, কারণ কিছু ক্ষেত্রে শ্বেত রক্তকণিকা কমে যেতে পারে।
৩. Deferasirox
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ও কার্যকর Iron Chelator।
এটি সাধারণত দিনে একবার নির্দিষ্ট নিয়মে খেতে হয়।
তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি—
- Serum Ferritin
- SGOT
- SGPT
- ALT
- AST
- Serum Creatinine
- Kidney Function Test
Ferritin পরীক্ষা কেন জরুরি?
Serum Ferritin শরীরে মোট আয়রনের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা দেয়।
এই রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক Iron Chelation Therapy-এর ডোজ নির্ধারণ করেন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলেও চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়
ডাঃ প্রশান্ত চৌধুরীর মতে, প্রতিটি ওষুধেরই কিছু সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।
তাই চিকিৎসকরা সবসময় Risk-Benefit Ratio বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।
সঠিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- নির্দিষ্ট সময়ে রক্ত নিন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না।
- নিয়মিত Serum Ferritin পরীক্ষা করুন।
- Liver ও Kidney Function পরীক্ষা করান।
- সঠিক Blood Matching নিশ্চিত করুন।
- অভিজ্ঞ Hemoglobinopathy Specialist-এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিন।
উপসংহার
বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার ফলে থ্যালাসেমিয়া আর আগের মতো ভয়ের রোগ নয়। নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন, সঠিক Iron Chelation Therapy, নিয়মিত পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অধিকাংশ রোগী দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং সঠিক ফলো-আপই থ্যালাসেমিয়া ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি।


