ত্বক শরীরের একটি অতিবৃহৎ ও অপরিহার্য আবরণ যা আমাদের শরীরের অনেক জটিল কাজ সম্পাদন করে। আমাদের শরীরে রোগজীবাণু প্রবেশ থেকে রক্ষা করে শরীর সুস্থ রাখে। আবার আমাদের ত্বক খুবই সচেতন ও সংবেদনশীল অঙ্গ।
সব বয়সের, লিঙ্গের ও জাতির মানুষের চামড়ায় নানা ধরনের অসুখ দেখা যায়। কিছু চর্মরোগ আছে যেগুলির মধ্যে বেশির ভাগই ক্ষণস্থায়ী বা অস্থায়ী। চিকিৎসায় অসুখগুলি সহজেই সেরে যায় বা কিছু সময় পর নিজে নিজেই চলে যায়। চিকিৎসা পরিভাষায়, যাকে অ্যাকিউট কন্ডিশন বলে। যেমন জ্বর ঠোঁটো, চুল পড়া, বয়ঃসন্ধির ব্রণ, ফোসকা ইত্যাদি।
আবার অনেক চর্মরোগ আছে যেগুলিকে ক্রনিক স্কিন কন্ডিশন বলা হয়। এগুলি হয় সহজে সারে না অথবা একেবারেই সারে না। উদাহরণ হিসাবে একজিমা, দাদ, সোরিয়াসিস, শ্বেতি, মেলানোমা এগুলির কথা বলা যায়। এইসব চর্মরোগেরই চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এবং এদের চিকিৎসায় ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে রোগীর জীবনযাত্রার ওপর মনোযোগ দেওয়া একান্ত দরকার। বাচ্চারাও বড়দের মতোই একইরকম বেশ কিছু চর্মরোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়। তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কয়েকটি চর্মরোগ বেশি উল্লেখযোগ্য যেমন- ডায়াপার র্যাশ, ডায়াপার ডার্মাটাইটিস, হাইবস, সেবোরিক ডার্মাটাইটিস, আচিল, দাদ, অ্যাকনে, মোলাসকাম ক্যান্টোজিয়াসাম ইত্যাদি। এই চর্মরোগগুলি অস্থায়ী (Temporary) এবং চিকিৎসায় এগুলি পুরোপুরি সেরে যায়।
চর্মরোগের কারণ সম্বন্ধে বলতে গেলে প্রথমেই বলা প্রয়োজন যে কিছু চর্মরোগ আছে যার কারণ আজও আমাদের অজানা।
দেখা গিয়েছে জটিল ধরনের ত্বকের অসুখ সৃষ্টি হয় জন্ম ও বংশবিষয়ক সংবেদনশীলতা ও পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার চাপের ফলে। এই প্রসঙ্গে অ্যালার্জির মতো ত্বকের অসুখের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তবে বেশির ভাগ চর্মরোগের জান্য কারণগুলি হল-ব্যাকটেরিয়া, ফ্যাংগাল, পরজীবী এবং ভাইরাস, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বল অবস্থা ও একই সঙ্গে কোনও সংক্রমণজনিত অসুখ, সংক্রামক ব্যাধিযুক্ত অন্য কোনও ব্যক্তির থেকে আসুখ, জিন এবং বংশগতি থেকে প্রাপ্ত অসুখ, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা, মানসিক সমসয় থেকে ত্বকের সমস্যা ইত্যাদি। এক একটি চর্মরোগের এক অথবা অধিক নির্দিষ্ট লক্ষণ থাকে যা ওই রোগটিকে নির্ণয় করতে সাহায্য করে। তবে গাত্র চর্মের ওপর ফুসকুড়ি বিশেষ (Rash) ও চুলকানিই হল বেশির ভাগ চর্মরোগের প্রধান উপসর্গ। যাই হোক না কেন যে কোনও রকমের চর্মরোগের নির্ণয়, রোগের অগ্রগতির পূর্বাভাস এবং চিকিৎসার জন্য রোগীর ও রোগের একটা পূর্ণ বিবরণ (মেডিকেল হিস্ট্রি) অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া রোগীর নিজের ও পরিবারের লোকজনের চর্মরোগের ইতিহাস জানা, রোগীর আগের ও বর্তমান পেশা ও শখ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া একান্ত জরুরি। আবার রোগী আগে কখনও বা বর্তমানে চর্মরোগের বা অন্য কারণের জন্য কোনওরকম চিকিৎসা করেছে বা করছে কি না, কোনও মলম ব্যবহার করেছে কি না জানা দরকার। এছাড়াও রোগীর মনের প্রবল আবেগ, অনুভূতি ও উত্তেজনার চাপের সঙ্গে রোগী যে চর্মরোগে আক্রান্ত তার কমা বা বাড়ার কোনওরকম সম্পর্ক আছে কি না তাও দেখা একান্ত প্রয়োজন।
ত্বকের রোগ সম্বন্ধীয় পরীক্ষা ও রক্ত পরীক্ষা ছাড়াও চামড়ার কিছু পরীক্ষা করাও একান্ত জরুরি যেমন-স্কিন বায়োপ্সি, অ্যালার্জি টেস্টিং, টিউবারকুলোসিস স্কিন টেস্ট ইত্যাদি।
চর্মরোগের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় বেশিরভাগ চর্মরোগকেই শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনও অসুখের কারণে ত্বকের উপরিভাগে সৃষ্ট স্থানীয় উপসর্গ হিসাবেই গণ্য করা হয়। এই অভ্যন্তরীণ পাীড়া জন্মগত অথবা রোগীর জীবনকালে অর্জিত হাতে পারে। হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দ্বারা অনেক প্রকার চর্মরোগের চিকিৎসায় খুবই ভালো ফল পাওয়া যায় এবং বেশ কিছু জটিল ত্বকের অসুখকে পুরোপুরি নির্মূল করাও সম্ভব হয়।
হোমিওপ্যাথি পদ্ধতিতে চর্মরোগে আক্রান্ত প্রত্যেক রোগীকেই ভিন্ন হিসাবে ধরা হয়। এভাবে রোগ ও রোগীর উপসর্গের ওপর ভিত্তি করেই ওষুধ নির্বাচন, ওযুষের ক্রম ও মাত্রা নির্ণয় করা হয়। নির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ওষুধ প্রয়োগের ফলে রোগীর শরীরের রোগ- প্রতিরোধ করার ক্ষমতা শক্তিশালী হয় এবং এর প্রভাবেই রোগ চাপা পড়ার বদলে শরীর হতে নির্মূল হয়ে যায়।
এখানে কয়েকটি সাধারণ চর্মরোগ এবং তাদের চিকিৎসার ব্যবহৃত কয়েকটি ওষুধের নাম বলা হল। তবে এগুলির ব্যবহার নিজে নিজে না করে কোনও অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের পরামর্শ মতোই করা উচিত। তবে শ্বেতি ও সোরিয়াসিস এই দুটি চর্মরোগ সহজে সারে না তবে এদের বিস্তার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব অনেক ক্ষেত্রেই।
একটা বিষয় অতি অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে কোনও চর্মরোগের চিকিৎসায় ওষুধ প্রয়োগই সব নয় সঙ্গে সঙ্গে পথ্য ও কিছু আনুষাঙ্গিক ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রয়োজন হয়। যথা-পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে চলা, আলো-বাতাস যুক্ত ঘরে বসবাস, আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার রাখা, প্রত্যহ স্নান করা, সাবান ও তেল বেশি ব্যবহার না করা, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, যে সমস্ত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণে চর্মরোগের বৃদ্ধি হয় তা বর্জন করা, বেশি শাক-সবজি খাওয়া, চা, কফি, অ্যালকোহল, চিংড়ি, কাঁকড়া, ডিম ইত্যাদি খাওয়া নিযেধ এবং ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম মাঝে মধ্যে ব্যবহার উপকারী। সর্বদা একটা বিষয় মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরি যে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কোনওভাবেই চর্মরোগের চিকিৎসা করা উচিত নয়।
রোগ
ওষুধ গুচ্ছ
একজিমা
আর্সেনিক, গ্রাফাইটিস, অ্যাসিড ক্রাইসো, মার্কসল, সালফার, পেট্রোলিয়াম, হিপার সালফ, সোরিনাম।
আর্টিকেরিয়া
এপিস মেল, আর্টিকা ইউরেনস, রাসটক্স, ডালকামরা, সালফার, আর্সেনিক।
আঁচিল
সিপিয়া, গুল, নাইট্রিক অ্যাসিড, কষ্টিকাম, সালফার, কালকেরিয়া, কার্ব, ডালকামরা, নেট্রাম মির্ভর।
ব্রণ
পিকরিক অ্যাসিড, ক্যালি আয়োড, ক্যালকেরিয়া কার্ব, নেট্রাম মিউর, সিপিয়া, ক্যালিরম, সোরিনাম, অ্যাসিড ফস।
খুশকি
ক্যালকেরিয়া কার্ব, ক্যালকেরিয়া ফস, সিপিয়া, করালি মিউর, গ্রাফাইটিস, টিউবার কুলিনাম, থুজা, আর্সেনিক।
ইম্পিটিগো
অ্যান্টিন ক্রুড, গ্রাফাইটিস, হিপার সালফ, মেজেরিয়াম, সাইলেসিয়া, পেট্রোলিয়ান, কোনিয়াম, রাসটক্স, থুজা।
ছুলি
ফসফরাস, নেট্রাম মিউর, সিপিয়া।
দাদ
আর্সেনিক, সালফার, সিপিয়া, গ্রাফাইটিস।
পাঁচড়া, চুলকানি
সালফার, মার্কসল, সোরিনাম, রাসটক্স, রাসভেন, কষ্টিকাম, ফ্যাগোপাইরাম।
ফোড়া
বেলেডোনা, মার্কসস, হিপার সালফ, সাইলিসিয়া, এনথ্রাসিন, মাইরেস্টিকা।
হারপিস
একোনাইট, বেলেডোনা, মার্কসল, এপিস মেল, রাসটক্স, ডালকামরা।
হাজা ক্ষত, ঘা শ্বেতি
মার্কসল, আর্সেনিক, পেট্রোলিয়াম, হিপার সালফ। হিপার সালফ, মার্কসল, সাইলেসিয়া, আর্সেনিক। আর্সেনিক সালফ ফ্রেন্ডাম, নেট্রাম মিউর, সালফার, সোরিনাম, সাইলেসিয়া, টিউবার কুলিনাম নেট্রাম সালফ, ক্যালকেরিয়া কার্ব ও ফস।
সোরিয়াসিস
সালফার, সোরিনাম, মার্কসল, আর্সেনিক, সাইলেসিয়া, ক্যালকেরিয়া কার্ব ও ফস, সিফিলিনাম, মেজেরিয়াম, লাইকোপোডিয়াম।


