আমাদের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য হার্টের স্বাস্থ্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে কার্ডিওভাসকুলার বা হার্টের সমস্যা একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হার্ট অ্যাটাক কীভাবে হয়, এর লক্ষণগুলো কী কী এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করলে আপনি হার্ট অ্যাটাক থেকে দূরে থাকতে পারবেন—সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হলো এই প্রতিবেদনে।
হার্ট অ্যাটাক আসলে কী?
হার্ট অ্যাটাক কী তা জানার আগে, আমাদের হার্টের স্বাভাবিক কাজ সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়া দরকার। আমাদের হার্ট বা হৃৎপিণ্ড মূলত একটি পাম্পের মতো কাজ করে, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে (যেমন কিডনি, লিভার ইত্যাদি) অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছে দেয়।
তবে শরীরকে সচল রাখার পাশাপাশি হার্টের নিজের পেশিরও সচল থাকার জন্য অক্সিজেন ও রক্তের প্রয়োজন হয়। হার্টের নিজস্ব পেশিতে রক্ত সরবরাহ করার জন্য যে বিশেষ রক্তনালীগুলো থাকে, সেগুলোকে বলা হয় করোনারি আর্টারি (Coronary Artery)।
যখন এই করোনারি আর্টারিতে কোনো কারণে ব্লক বা বাধা তৈরি হয় এবং হার্টের পেশিতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তখন যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack) বলা হয়। সহজ কথায়, রক্তনালীতে সম্পূর্ণ বা আংশিক ব্লকেজের ফলেই হার্ট অ্যাটাক ঘটে।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ: ক্লাসিক বনাম সাইলেন্ট লক্ষণ
হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকে তীব্র ব্যথা। তবে সবার ক্ষেত্রে এই লক্ষণ এক নাও হতে পারে। তাই সাধারণ এবং ব্যতিক্রমী—উভয় ধরনের লক্ষণ সম্পর্কেই আমাদের সচেতন থাকা উচিত।
১. হার্ট অ্যাটাকের ক্লাসিক বা সাধারণ ব্যথা
হার্টের ব্যথার কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
- পরিশ্রমের সময় ব্যথা: সাধারণত যখন কেউ কোনো ভারী কাজ করেন, হাঁটাচলা করেন বা ব্যায়াম করেন, তখন এই ব্যথা বেশি অনুভূত হয়।
- বিশ্রামের সময় কমে যাওয়া: প্রাথমিক অবস্থায় বসে থাকলে বা বিশ্রামে থাকলে এই ব্যথা সাধারণত হয় না। তবে সমস্যা যদি অত্যন্ত গুরুতর হয় বা রক্তনালী প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তখন বিশ্রামের অবস্থাতেও বুকে অনবরত ব্যথা হতে পারে।
২. “সাইলেন্ট” হার্ট অ্যাটাক (লক্ষণহীন হার্ট অ্যাটাক)
সবার ক্ষেত্রে যে বুকে তীব্র ব্যথা হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের ব্যথা ছাড়াই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে:
- ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে: ডায়াবেতিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যথার অনুভূতি বহনকারী স্নায়ুগুলো (Nerves) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তারা হার্ট অ্যাটাকের তীব্র ব্যথা অনুভব করতে পারেন না।
- বিকল্প লক্ষণ: বুকে ব্যথা না হয়েও হঠাৎ করে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হওয়া, সামান্য হাঁটলেই হাঁপিয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ঘাম হওয়া—এগুলোও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।
গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নাকি হার্ট অ্যাটাক? বুঝবেন কীভাবে
আমাদের মধ্যে অনেকেই একটি মারাত্মক ভুল করেন, তা হলো হার্ট অ্যাটাকের ব্যথাকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা গ্যাসের ব্যথা ভেবে অবহেলা করা।
যেহেতু পাকস্থলী এবং হার্টের স্নায়ুগুলো খুব কাছাকাছি থাকে, তাই হার্টের প্রাথমিক অস্বস্তি বা ব্যথাকে অনেকেই এসিডিটি মনে করেন। অনেক সময় রোগীরা গ্যাসের ওষুধ খেয়ে সাময়িক আরাম পান এবং ভাবেন সমস্যা মিটে গেছে। কিন্তু এর আড়ালে হার্টের রোগটি ধীরে ধীরে আরও মারাত্মক রূপ নিতে থাকে।
পার্থক্য বোঝার উপায়:
- পরিশ্রম বনাম হজম: আপনার তথাকথিত “গ্যাসের ব্যথা” যদি হাঁটার সময় বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বাড়ে এবং একটু বসলে বা বিশ্রাম নিলে কমে যায়, তবে এটি গ্যাস্ট্রিকের নয়, बल्कि হার্টের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
- অন্যান্য লক্ষণ: সাধারণ গ্যাসের ব্যথার সাথে কখনো চোয়াল বা বাম হাতে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে না, কিংবা হঠাৎ করে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট বা ঠাণ্ডা ঘাম হয় না।
হার্ট অ্যাটাকের প্রধান ঝুঁকিসমূহ (Risk Factors)
হার্ট অ্যাটাক হঠাৎ করে হলেও, এর পেছনের ব্লকেজ কিন্তু বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। কিছু অভ্যাস এবং শারীরিক সমস্যা এই ব্লকেজের প্রক্রিয়াকে অনেক দ্রুত করে তোলে:
- ধূমপান (Smoking): অনেকে মনে করেন ধূমপান কেবল ফুসফুসের ক্যানসার তৈরি করে। কিন্তু এটি হার্টের জন্য সমান মারাত্মক। ধূমপান রক্তনালীতে চর্বি বা ব্লক জমার প্রক্রিয়াকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে খুব কম বয়সেই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
- উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension): অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণে রক্তনালীর দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ব্লক তৈরিতে সাহায্য করে।
- ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে তা সময়ের সাথে সাথে হার্টের রক্তনালী এবং স্নায়ুগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার ও স্থূলতা: খাবারে অতিরিক্ত তেল, চর্বি (যেমন খাসির মাংস বা মাটন), প্রসেসড ফুড এবং অতিরিক্ত মশলাদার খাবার বেশি খেলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে, যা আর্টারিতে ব্লক তৈরি করে।
জরুরি অবস্থায় করণীয়: কী করবেন?
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান। চিকিৎসা পেতে যত দেরি হবে, হার্টের পেশি তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
| পরিস্থিতি | করণীয় পদক্ষেপ |
| বাড়িতে থাকাকালীন | কোনো রকম সময় নষ্ট না করে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব এমন একটি হাসপাতালে নিয়ে যান যেখানে জরুরি কার্ডিয়াক কেয়ার বা হার্টের চিকিৎসার উন্নত সুবিধা রয়েছে। |
| হাসপাতালে পৌঁছানোর পর | চিকিৎসকেরা রোগীর অবস্থা পরীক্ষা করে দ্রুত ইসিজি (ECG), চেস্ট এক্স-রে এবং ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echo) করেন। ব্লকেজ নিশ্চিত হলে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। |
| গোল্ডেন আওয়ার (Golden Hour) | হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথম ৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা যায়, তবে বিশেষ ইনজেকশন বা ইমার্জেন্সি অ্যানজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে রক্তনালীর ব্লকটি খুলে দিয়ে হার্টকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব। |
হার্ট অ্যাটাকের পর জীবনযাত্রা: কিছু ভুল ধারণা
অনেকের মনেই এই ভুল ধারণা রয়েছে যে, একবার হার্ট অ্যাটাক বা হার্টের কোনো বড় অপারেশন হলে আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যাবে না বা ভারী কোনো কাজ করা যাবে না—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসার (যেমন অ্যানজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি) পর একজন মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পুরোপুরি স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনে ফিরে আসতে পারেন।
সুস্থ থাকার কিছু জরুরি টিপস:
- নিয়মিত হাঁটাচলা ও হালকা ব্যায়াম: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটাচলা এবং হালকা ফিজিওথেরাপি হার্টের পেশিকে আবার শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। (মনে রাখবেন, রোগ নির্ণয়ের আগে বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট থাকলে ভারী ব্যায়াম এড়ানো উচিত, তবে চিকিৎসার পর নিয়মিত হালকা হাঁটাচলা করা অত্যন্ত উপকারী)।
- খাবারে নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল এবং হার্টের জন্য উপকারী খাবার রাখতে হবে।
- নিয়মিত ফলো-আপ ও অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খাওয়া এবং রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। সেই সাথে ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা পুরোপুরি বর্জন করতে হবে।
শেষ কথা
আপনার হার্টের যত্ন নেওয়ার অর্থ হলো শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তন বা লক্ষণগুলোর প্রতি সতর্ক থাকা। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম বা বুকে কোনো অস্বস্তি হলে তা গ্যাস্ট্রিক ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতনতাই পারে আপনার হার্টকে সুস্থ রাখতে।


